মহামায়ার নিত্য নিরঞ্জনের ধ্যান
জাগ্রত চেতনা: দেখি, শুনি, পড়ি, জানি – মননে-বচনে-কর্মে সমাজ জাগরণ
মহামায়ার নিত্য নিরঞ্জনের ধ্যান
কান্দিতে লাগিল দেবী ভাবিয়া না পায়।
কোথা প্রভু কোথা তুমি কি করি উপায়।।
তোমার আদেশে প্রভু করি আরাধনা।
একে একে তিন জনে জানাই বাসনা।।
তারা সবে এক সুরে এক কথা কয়।
পত্নী রূপে করিলনা গ্রহণ আমায়।।
অনাদির আদি প্রভু নিত্য নিরঞ্জন।
তোমার আদেশ আমি করেছি পালন।।
এবে তুমি দেখা দাও আসিয়া হেথায়।
বিরহ বেদনায় আজি প্রাণ বাহিরায়।।
হেনকালে নিরঞ্জন আসিয়া তথায়।
বলে দেবী কান্দিও না করিব উপায়।।
শুন শুন ওগো দেবী আমার বচন।
শিবের সঙ্গেতে তব হইবে মিলন।।
শিব আছে সরোবর তীরেতে বসিয়া।
তাহার নিকটে যাও জলেতে ভাসিয়া।।
এত বলি নিরঞ্জন কহিতে লাগিল।
মহাযোগ তত্ত্ব প্রভু দেবীকে জানাল।।
রেচক কুম্ভক আদি শিখাল দেবীরে।
আর কত শিক্ষা দিল থাকিয়া অন্তরে।।
দেবীকে বলিল প্রভু কুম্ভক করিয়া।
জলেতে ভাসিয়া যাও তথায় চলিয়া।।
এত বলি মহা প্রভু হল অন্তর্ধ্যান।
জলেতে ভাসিয়া দেবী হলো আগুয়ান।।
জলস্রোতে ভেসে চলে দেবী মহামায়া।
মরার মতন দেবী বেড়ায় ভাসিয়া।।
ধ্যানেতে বসিয়া ছিল দেব পঞ্চানন।
অকস্মাৎ সদানন্দ মেলিল নয়ন।।
চাহিয়া দেখেন শিব স্বপনের প্রায়।
জলের উপরে ভেসে কি যেন কি যায়।।
টানিয়া তুলিল শিব সরোবর তীরে।
খল খল মহামায়া হাসে উচ্চস্বরে।।
মহামায়া বলে তুমি করিলে কি কর্ম্ম।
ভাসিয়া চলেছি আমি নাহি জানি মর্ম্ম।।
কেন তুমি হস্ত ধরি তুলিলে আমারে।
সার কথা তবে আমি কহি যে তোমারে।।
মম হস্ত ধরে তুমি তুলিলে যখন।
পত্নীরূপে আজি মোরে করহে গ্রহণ।।
নতুবা তোমারে আমি অভিশাপ দিব।
তাহা না হইলে আমি জীবন ত্যাজিব।।
শুনিয়া দেবীর বাণী চিন্তে শূলপাণি।
কহিতে লাগিল শিব জুড়ি দুই পাণি।।
এবে এক কার্য কর শোন দিয়া মন।
দিয়াছে আমারে প্রভু রুদ্র হুতাশন।।
আমি দিব অগ্নি জ্বালি তোমার লাগিয়া।
পুড়িবে আগুনে তুমি শোন মন দিয়া।।
যোগবলে দেহ তুমি করিবে ধারণ।
আরবার জ্বালাইব রুদ্র হুতাশন।।
এইভাবে পোড়াইব শত অষ্ট বার।
পার যদি ওগো দেবী কর অঙ্গীকার।।
তারপরে তুমি আমি হইব মিলন।
পত্নীরূপে তোমাকেই করিব গ্রহণ।।
এই কথা সদানন্দ যখন কহিল।
আনন্দিত হয়ে দেবী কহিতে লাগিল।।
জ্বাল’হ এখনি তব রুদ্র হুতাশন।
পোড়াইব এই দেহ এই মোর পণ।।
যোগ বলে দেহ পুনঃ করিব ধারণ।
পোড়াইবে মম দেহ যত লয় মন।।
একথা শুনিয়া শিব আনন্দিত হ’ল।
বলিতে বলিতে শিব আগুন জ্বালিল।।
জ্বলিল আকাশ ভেদি রুদ্র হুতাশন।
আগুনের মধ্যে দেবী করিল শয়ন।।
সোনার বরণ তনু আগুনেতে পোড়ে।
কণ্ঠ হাড় কেটে রাখে গণনার তরে।।
এই ভাবে দেবী দেহ করে ভষ্মময়।
নাভিমূল পোড়ে না’ক জ্বলে ফেলে দেয়।।
এই ভাবে পোড়ে দেবী অষ্টশত বার।
অগ্নি নির্বাপিত করে দেব দিগম্বর।।
নাভিমূল সরোবরে করে বিসর্জ্জন।
শত অষ্ট নীল পদ্ম হইল সৃজন।।
সেই হতে দেবীদহ সরোবর হয়।
সে সব লিখিতে গেলে পুথি বেড়ে যায়।।
শত অষ্ট কন্ঠ হাড় গ্রন্থন করিয়া।
শিবের গলায় দেবী দিল পরাইয়া।।
পত্নীরূপে সদানন্দ করিল গ্রহণ।
প্রেমানন্দে দুইজনে হইল মিলন।।
মহামায়া বলে শুন ওহে প্রাণনাথ।
তব শ্রীচরণে আমি করি প্রণিপাত।।
আমাকে পোড়ালে তুমি শত অষ্ট বার।
কোনও তত্ত্ব পেয়েছো কি ইহার ভিতর।।
শুনিয়া দেবীর বাণী কহে শূলপাণি।
তার কিছু তত্ত্ব কথা বলিব এখনি।।
যখনেতে জ্বালি আমি রুদ্র হুতাশন।
‘হো’ ‘হো’ শব্দ উচ্চারিত হইল তখন।।
রুদ্র অগ্নি যখনেতে নির্বাপিত হয়।
‘রি’ ‘রি’ শব্দ উচ্চারিত হইল তথায়।।
দুই শব্দ মিলনেতে “ হরি ” নাম হয়।
হরিনাম নিতে সাধ জাগিল হৃদয়।।
দেবী বলে প্রাণনাথ কহিনু তোমারে।
হরিনাম শুনিবারে বাসনা অন্তরে।।
মধুমাখা হরিনাম কহ আরবার।
হরিনামে প্রেমানন্দ হতেছে আমার।।
বলিতে বলিতে দেবী হরিনাম করে।
হরিনামে মাতোয়ারা প্রেম অশ্রু ঝরে।।
মহামায়া নাম করে দেখি সদানন্দ।
হরিনাম করিবারে বাড়িল আনন্দ।।
হরিনামে মাতোয়ারা হ’লো দুই জন।
প্রেমে গদ গদ চিত্ত ঝরে দু’নয়ন।।
উঠিল নামের ধ্বনি গগন মণ্ডলে।
নাম আকর্ষণে প্রভু এসে দেখা দিলে।।
কহিতে লাগিল প্রভু নিত্য নিরঞ্জন।
হরিনাম ক্ষান্ত কর ওহে ত্রিলোচন।।
শিব বলে ওগো প্রভু কি কথা কহিলে।
হরিনাম নিতে কেন নিষেধ করিলে।।
কহ কহ কহ প্রভু ধরি তব পায়।
হেন নাম নিলে কিবা অপরাধ হয়।।
প্রভু বলে নাম নিতে অপরাধ নাই।
গোপনে থাকিবে নাম তোমাকে জানাই।।
শিব বলে কেন প্রভু গোপন থাকিবে।
ইহার বৃত্তান্ত কথা আমাকে কহিবে।।
প্রভু বলে সদানন্দ শুন দিয়া মন।
ইহার বৃত্তান্ত কথা কহিব এখন।।
চারি যুগে চারি নাম হইবে প্রচার।
তারক ব্রহ্ম নামেতে জীবের নিস্তার।।
কলির মধ্যাহ্ন কালে হ’ব অবতার।
হরিনাম সেই দিনে হইবে প্রচার।।
হরিনামে জন্ম লব যশোমন্ত ঘরে।
সে দিন তোমাকে আমি লব সঙ্গে করে।।
পুত্ররূপে তোমা আমি করিব পালন।
উচ্চস্বরে হরিনাম লবে সর্ব্বক্ষণ।।
শিব বলে ওগো প্রভু কহিনু তোমারে।
হেন সঙ্গ পাব আমি কত দিন পরে।।
প্রভু বলে সদানন্দ শুন মন দিয়া।
অষ্টাবিংশ মন্বন্তর তারপরে গিয়া।।
চারি যুগে যত ভক্ত করি একত্তর।
সঙ্গে সঙ্গে লয়ে আমি হব অবতার।।
গোপী কোপি আর যত ভাবের আশ্রয়।
বাকী না রাখিব আমি জানাব সবায়।।
শাক্ত,শৈব্য,ন্যাসী,যোগী,সৌর গান পত্য।
সবাকে জানাব আমি এ সকল তত্ত্ব।।
গৃহস্থ প্রসস্থ ধর্ম্ম জীবে শিক্ষা দিতে।
অবতীর্ণ হব আমি গিয়া অবনীতে।।
মধুকৃষ্ণা ত্রয়োদশী শুভ লগ্ন পেয়ে।
জনম লভিব আমি ধরাধামে গিয়ে।।
এত যদি কহিলেন নিত্য নিরঞ্জন।
দুই জনে করিলেন চরণ বন্দন।।
সেই হতে হরিনাম গোপনেতে ছিল।
এবে এসে ওড়াকান্দি প্রকাশ হইল।।
তাই বলি ওরে মন হরি হরি বল।
হরিনামে তরী করে ভবপারে চল।।
কান্দিয়া বিনোদ বলে ওগো দয়াময়।
অন্তিম কালেতে মোরে ঠেলিও না পায়।।