প্রকাশকের নিবেদন (শ্রীকুমুদরঞ্জন মজুমদার)
জাগ্রত চেতনা: দেখি, শুনি, পড়ি, জানি – মননে-বচনে-কর্মে সমাজ জাগরণ
প্রকাশকের নিবেদন (শ্রীকুমুদরঞ্জন মজুমদার)
শ্রীশ্রীঠাকুরের কৃপায় “শ্রীশ্রীগুরুচাঁদ চরিত” লিপিবদ্ধ ও মুদ্রিত হইয়া জনসমাজে প্রকাশিত হইল। এই গ্রন্থে যুগাবতার শ্রীশ্রীহরিঠাকুরের অসমাপ্ত লীলা পুর্ণকারী রাজর্ষি শ্রীশ্রীগুরুচাঁদ ঠাকুরের ঘটনা বহুল বিচিত্র লীলাকাহিনী বর্ণিত হইয়াছে। এই মহামানব বারশত চুয়ান্ন বঙ্গাব্দে ওড়াকান্দী ধামে শ্রীশ্রীহরিচাঁদ ঠাকুরের পুত্ররূপে আবির্ভূত হন। শ্রীশ্রীহরিচাঁদ ঠাকুরের আবির্ভাবে বাংলার নিপীড়িত সমাজ সমূহের অসাড় প্রাণে একটি জাগরণের আভাস মাত্র দেখা গিয়াছিল। শ্রীশ্রীগুরুচাঁদ ঠাকুরের প্রেরণায় ও সুপরিচালনায় তাহাদিগের প্রাণে এক অপ্রতিহতশক্তির বিকাশ হইয়াছে। গ্রন্থকার মহাশয় এই গ্রন্থে এই তত্ব পরিষ্কাররূপে প্রকাশ করিয়াছেন। শ্রীশ্রীগুরুচাঁদ ঠাকুরের জীবনকে ধর্ম ও কর্মের একটি অপূর্ব মিলনক্ষেত্র বলা যায়। ধর্ম ও কর্মের সেই অপূর্ব মিলন-পথে তিনি নিজ ভক্তগণকে পরিচালিত করিয়াছিলেন। “কর্মহীন ধার্মিকতাকে” তিনি কখনও ধর্ম পদবাচ্য বলিয়া গণ্য করিতেন না। বস্তুতঃ তাহাকে “ধর্মের ভাণ' মাত্র বলিতেন। তাঁহার জীবনে অঙ্গাঙ্গীভাবে এই দুইটি ভাবধারার এমনি পূর্ণ বিকাশ হইয়াছিল যে একদিকে “ধর্মের পূর্ণ বিকাশ” জানিয়া ভক্তসংঘ যেমন তাহাকে তদীয় পিতা শ্রীশ্রীহরিচাঁদ ঠাকুরের অসমাপ্ত লীলা পূর্ণকারী অবতার বলিয়া বিশ্বাস ও ভক্তি করিয়া থাকেন অপর পক্ষে জনসাধারণ তাঁহাকে “কর্ম সাধানার পূর্ণ বিগ্রহ” বলিয়া শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা প্রদর্শন করিয়া থাকেন। গ্রন্থকার স্বীয় গ্রন্থে এই কয়েকটি ভাবধারা সুন্দররূপে ফুটাইয়া তুলিয়াছেন। প্রতিটি অধ্যায়ের মধ্যে গ্রন্থকার এই সমস্ত ভাবধারার আদর্শ-প্রতীক হিসাবে শ্রীশ্রীগুরুচাঁদকে দেখাইয়াছেন। কর্মের সঙ্গে সঙ্গে পিতার আদেশ-বাণীর দোহাই দিয়া শ্রীশ্রীগুরুচাঁদ ঠাকুর যে সমস্ত লীলা প্রকাশ করিয়া গিয়াছেন সে সমুদয় যে কোন অবতীর্ণ মহাপুরুষ বা মহামানব হইতে অধিকতর বিচিত্রতাপূর্ণ ও জগতের মঙ্গলদায়ক সন্দেহ নাই। অথচ বিধি-নির্দিষ্ট জীব-গণ্ডীকে তিনি কখনও অবহেলা করেন নাই বা ডিঙ্গাইতে ইচ্ছা করেন নাই। তাই লৌকিক জীবনের মধ্যে বহুবিধ দুঃখ যন্ত্রণার মধ্যেও তাঁহাকে আমরা অটল অচল হিমাচলের মত উচ্চঃশিরে দাঁড়াইয়া থাকিতে দেখিয়াছি কিন্তু কখনও কোন কারণে নিজের জন্য বিধির বিধানকে লংঘন করিবার ইচ্ছা দেখি নাই। বীর সাধকের ন্যায় তাঁহার এই অভূতপূর্ব আচরণের ফলে স্বীয় ‘ঈশ্বরত্বকে’ তিনি লোক লোচনের অন্তরালে রাখিতে প্রয়াস পাইয়াছিলেন কিন্তু ভক্ত তাঁহাকে ভুলে নাই। ভক্ত তাঁহার মধ্যে বহু ঐশী শক্তির বিকাশ দেখিয়াছে, তাঁহাকে চতুর্ভুজ ধারণ করিতে দেখিয়াছে, তাঁহার কথায় মৃত দেহে প্রাণ ফিরিয়া আসিতে দেখিয়াছে, তাঁহাকে সর্বজ্ঞ ব্যাপী দেখিয়াছে। গ্রন্থকার উক্ত গ্রন্থে একমাত্র ভক্তের দৃষ্টিকে মান্য করিয়া চলেন নাই বস্তুতঃ শ্রীশ্রীগুরুচাঁদের লৌকিক জীবনের প্রতিস্তরে তিনি যেভাবে কি ভক্তের চক্ষে, কি জনসাধারণের চক্ষে প্রতিভাত হইয়াছিলেন তাহাই বর্ণনা করিয়া লিপিবদ্ধ করিয়া গিয়াছেন। শুধু তাহাই নহে সঙ্গে সঙ্গে পৃথিবীর বুকে যে সমস্ত সমসাময়িক ঘটনা ঘটিয়াছে, যুগান্তকারী যে সমস্ত ঐতিহাসিক ঘটনা দেখা গিয়াছে সমস্তই নিখুঁতভাবে বর্ণনা করিয়াছেন। বস্তুতঃ এই গ্রন্থখানি চতুরাশ্রমধর্মী নরনারীদিগের জন্যই লিখিত হইয়াছে। শ্রীশ্রীগুরুচাঁদকে কেন্দ্র করিয়া আশ্রম ধর্মের যাবতীয় ধারাগুলি দেখান হইয়াছে। সঙ্গে সঙ্গে সমসাময়িক বিশ্ব-বৈচিত্র্য ও তাহার সহিত শ্রীশ্রীগুরুচাঁদের নিবিড় যোগ এবং সামঞ্জস্য রক্ষার চিত্র দেখান হইয়াছে।
সুতরাং গ্রন্থখানি একাধারে দর্শন, সাহিত্য ও ইতিহাসের সৃষ্টি করিয়াছে। আর একটি কথা। গ্রন্থখানিতে গ্রন্থকার মহোদয় শ্রীশ্রীহরিচাঁদের জীবন-আলেখ্য ভিন্ন আরও এমন একটি গৌরবময় কার্য করিয়াছেন যাহার জন্য নমঃশূদ্র সমাজ তাঁহার নিকট চিরকাল ঋণী থাকিবে। সেই কার্যটি হইতেছে এই যে শ্রীশ্রীগুরুচাঁদের লৌকিক জীবনের লীলাকাহিনী বর্ণনার সঙ্গে সঙ্গে তাঁহাকে কেন্দ্র করিয়া গ্রন্থকার মহোদয় প্রায় শতবর্ষ পূর্ব হইতে অদ্য পর্যন্ত নমঃশূদ্র সমাজের ক্রমোন্নতি তথা উথানপতনের একটি সুন্দর ইতিহাস লিখিয়াছেন; সঙ্গে সঙ্গে নমঃশূদ্র জাতির উৎপত্তি সম্বন্ধে যু্ক্তিপূর্ণ গবেষণা দ্বারা নমঃশূদ্র জাতির ব্রাহ্মণত্ব প্রমাণ করিয়াছেন। এতদ্ব্যতীত নমংশূদ্র সমাজে সেই আদি শৈশব কাল হইতে যে সমস্ত মহান পিতৃগণ তাহাকে রক্ষা করিয়াছেন, তাহাকে সর্বপ্রকারে উন্নত করিয়া বিশ্বসভায় আসন দিয়াছেন, তাঁহাদিগের জীবনী ও কার্যাবলী ইহাতে বর্ণিত হইয়াছে। বস্তুতঃ গ্রন্থখানি আদ্যোপান্ত পাঠ করিয়া আমার প্রাণে যে ধারণার উদ্ভব হইয়াছে তাহাই সর্বধারণ পাঠকগণের সম্মুখে উপস্থিত করিলাম এবং আমি আশা করি পাঠকগণ আমার সহিত এ বিষয়ে সানন্দচিত্তে একমত হইবেন। গ্রন্থকার কবি তাহাতে সন্দেহ নাই এবং কাব্যলক্ষ্মীর পূজাবেদীমূলে এই তাঁহার প্রথম অর্ঘ। মানস-নন্দন-কানন-জাত পারিজাত স্তবকে তিনি যে অর্ঘ সাজাইয়াছেন তাহা সত্য সত্যই অতুলনীয় হইয়াছে। কোন কোন অধ্যায়ের মধ্যে এমন সুনিপুণভাবে তিনি লেখনী চালাইয়াছেন যাহাতে মনে হয় যেন কোনও ভক্ত পূজারী তাহার প্রাণের দেবতার, সম্মুখে অশ্রুজলের মধ্য দিয়া আপনার “ব্যথার পুজার” গান গাহিয়া চলিয়াছে! এমনই জীবন্ত! এমনই মূর্তিমন্ত! আবার কোনও কোন অধ্যায় পাঠ করিতে করিতে এমনই মনে হইয়াছে যেন সংসার তাপদগ্ধ জীবনকে দূরে ফেলিয়া কোনও ছায়া-সুনিবিড় তপোবনে ঋষির মুখে তত্ত্বকথা শুনিতেছি! কোন অধ্যায় পাঠ করিতে করিতে শরীর রোমাঞ্চিত হইয়াছে, কোনও অধ্যায় পাঠ করিতে করিতে “মানুষে মানুষে হিংসা” দেখিয়া ক্ষুদ্ধ হইয়াছি, পরন্তু কোন অধ্যায়ের নির্দোষ হাস্যরসের মধ্যে প্রভূত আনন্দ লাভও করিয়াছি। এইরূপে সর্বনীতির পূর্ণ-প্রতীক শ্রীশ্রীগুরুচাঁদের জীবন-আলেখ্যের মধ্যে ভক্ত-কবি সর্বরসের অবতারণা করিয়া পূজার নৈবেদ্যকে ষোড়শোপচারে পূর্ণাঙ্গ করিয়াছেন। বস্তুতঃ নমঃশূদ্র সমাজের কোন ব্যক্তিই ইতিপূর্বে এত বৃহৎ এবং সর্বরস-সমাবিষ্ট কাব্যগ্রন্থ রচনা করিতে পারেন নাই; শুধু তাহাই নহে বাংলা ভাষায়ও এই প্রকারের রসযুক্ত সুবৃহৎ কাব্যগ্রন্থ খুব কমই রচিত হইয়াছে। মহাকাব্য রামায়ণ রচনা করিয়া বাল্মীকি অমর হইয়াছেন; মহাকাব্য মহাভারত রচনা করিয়া ব্যাসমুনি অক্ষয়কীর্তি অর্জন করিয়াছেন; শ্রীশ্রীচৈতন্যচরিতামৃত লিখিয়া কৃষ্ণদাস কবিরাজ অমরত্ব লাভ করিয়াছেন; যুগাবতার শ্রীশ্রীহরিচাঁদ ঠাকুরের লীলাকাহিনী ‘শ্রীশ্রীহরিলীলামৃত’ লিখিয়া কবি রসরাজ সরকার অক্ষয় জীবন লাভ করিয়াছেন; এই মহাকাব্য “শ্রীশ্রীগুরুচাঁদ চরিত” লিপিবদ্ধ করিয়া ‘কবিশেখর’ শ্রীমহানন্দ হালদার চির-অমরত্ব লাভ করিলেন। শ্রীশ্রীগুরুচাঁদের উত্তর সাধক পৌত্র, মতুয়া মহাসংঘাধিপতি ‘ঠাকুর’ শ্রীশ্রীপ্রমথরঞ্জন এই মহাকাব্য পাঠ করিয়া গ্রন্থকারকে যে ভাষায় আশীর্বাদ করিয়া পত্র দিয়াছিলেন তাহার কয়েক পংক্তি উল্লেখ করিয়া আমি এই প্রবন্ধ শেষ করিব।
(শ্রীশ্রীপ্রথমরঞ্জনের লিখিত পত্রাংশ হইতে উদ্ধৃত)
“আর অধিক কি লিখিব। এই গ্রন্থ লিখিয়া আপনি ঠাকুরদাদাকে অমর করিলেন। আর আপনিও অমর হইলেন। যতদিন বাঙ্গালী ও বাংলা ভাষা পৃথিবীতে থাকিবে ততদিন আপনার নাম স্বর্ণাক্ষরে লিখিত থাকিবে। আমি তথা মতুয়া সমাজ চিরদিন এই গ্রন্থের জন্য ঋণী রহিলাম। গ্রন্থশেষে নানা কথা মনে পড়িয়া চোখে জল আসিতেছে। ঠাকুর আপনার মনের ইচ্ছা পূর্ণ করুন ইহাই তাঁহার একান্ত কামনা।
চিরস্নেহশীল পি.আর. ঠাকুর”
এই স্থলে আমি গ্রন্থকার মহোদয়ের সংক্ষিপ্ত জীবন বৃত্তান্ত উল্লেখ করিতেছি। ইনি খুলনা জিলার রামপাল থানার অধীন বেতকাটা গ্রামে নমঃশূদ্র কুলে জন্মগ্রহণ করিয়াছেন। ইহার পিতার নাম মহাত্মা রাধাকান্ত হালদার। মাতার নাম জানকী দেবী। ইনি পিতার সর্বজ্যেষ্ঠ সন্তান। ইহার দশ বর্ষ বয়ঃক্রম কালে ইহার জননী পরলোক গমন করেন। ইনি মহাত্মা শ্রীশ্রীগোপালচাঁদ সাধু ঠাকুরের মাতুল-পৌত্র। ইহার খুল্লতাত মহাত্মা মাধব চন্দ্র হালদার একজন পরম সাধক ও শ্রীশ্রীগুরুচাঁদের একজন পরম ভক্ত ছিলেন। তিনি শ্রীশ্রীগোপালচাঁদের একসঙ্গে মহাত্মা শ্রীশ্রীদেবীচাঁদের নিকট হইতে মতুয়া-ধর্ম্ম গ্রহণ করেন। শ্রীশ্রীগোপালচাঁদের মত তিনিও বহু নির্যাতন সহ্য করেন। তাঁহারই আদর্শে পরে হালদার বংশের সকলেই শ্রীশ্রীগোপালচাঁদের আশ্রয়ে মতুয়াধর্ম গ্রহণ করেন। বাল্যকাল হইতেই গ্রন্থকার একজন মেধাবী ছাত্র বলিয়া পরিচিত ছিলেন। মাধবচন্দ্রের একটি মাত্র পুত্র অল্প বয়সে পরলোক গমন করে। মাধবচন্দ্র সেই সময় হইতে এই ভ্রাতুষ্পুত্রটিকে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করিবার জন্য বিশেষ আগ্রহশীল হইয়া উঠেন। এই কারণে তিনি ভ্রাতুষ্পুত্রটিকে শ্রীশ্রীগুরুচাঁদের নিকট উপস্থিত করিয়া আশীৰ্বাদ ভিক্ষা করিয়াও রাখেন। প্রাণের ইচ্ছা প্রাণে থাকিতে থাকিতেই তিনি ইহলোক ত্যাগ করেন। এই সময়ে গ্রন্থকারের কনিষ্ঠ খুল্লতাত রতিকান্ত হালদার মহোদয় আগ্রহ সহকারে গ্রন্থকারের পাঠে উৎসাহ দিতে থাকেন। গ্রন্থকারের পিতা একজন সরল সহজ সাধু ব্যক্তি। তাঁদের সৌজন্যে ও উদারতায় সকলেই বাধ্য। কনিষ্ঠ ভ্রাতার উপর পুত্রের শিক্ষার ভার ছাড়িয়া দিয়া তিনি নিশ্চিন্ত হইয়াছিলেন। এ সময়ে গ্রন্থকারের ভাগ্যে শ্রীশ্রীগোপাল চাঁদের সঙ্গলাভ করিবার সুযোগ হইয়াছিল। তাঁহারই আদেশে ও করুণায় তিনি জীবনপথে চলিতেছিলেন। এই সময়ে সংসারে অনটন দেখা দেয় এবং গ্রন্থকারের পাঠ বন্ধের উপক্রম হয়। শ্রীশ্রীগোপালচাঁদের প্রচেষ্টায় এই সময় হইতে গ্রন্থকারের খুল্ল-পিতামহ-শ্রীযুক্ত সোনারাম হালদার মহোদয় ব্যয়ের অংশগ্রহণ করিলে গ্রন্থকারের উচ্চশিক্ষা লাভের পথ পরিষ্কার হইল। তিনি বাগেরহাট ও কলিকাতা শহরে অধ্যায়ন করিয়া বি.এল. পাশ করেন এবং কিছুদিন শিক্ষকতা করিবার পর বাগেরহাট শহরে ওকালতি ব্যবসায় আরম্ভ করেন। বাল্যকাল হইতেই গ্রন্থকারের কবিতা রচনা করিবার অভ্যাস ছিল। তাহার রচিত কয়েকটি কবিতা কোন কোন মাসিক পত্রিকায় প্রকাশিত হইয়াছিল। ওকালতি ব্যবসায় মনের সহিত গ্রহণ করিতে না পারায় তিনি কিছুকাল পূর্ব হইতে উহা এক প্রকার পরিত্যাগই করিয়াছেন বলা যায়। পাঠ্য ও কর্মজীবনের মধ্যেও প্রায় সময়ে শ্রীশ্রীগোপালচাঁদের সঙ্গে তিনি ওড়াকান্দী গমন করিতেন এবং শ্রীশ্রীগুরুচাঁদের অমূল্য উপদেশরাজি শ্রবণ করিতেন। শ্রীশ্রীগুরুচাঁদ ও শ্রীশ্রীগোপালচাঁদ এবং অন্যান্য মতুয়া মহাত্মাগণ কৃপা পরবশ হইয়া গ্রন্থকারকে বিশেষ স্নেহের চক্ষে দেখিতেন এবং দেখিয়া থাকেন। মতুয়া মহাসংঘাধিপতি শ্রীশ্রীপ্রমথরঞ্জনের সহিত বাল্যকাল হইতেই তাহার পরিচয় ছিল এবং তিনিও গ্রন্থকারকে অনুগ্রহ করিয়া যথেষ্ট স্নেহ করিয়া থাকেন। এই সমস্ত মহাত্বাগণের আশীর্বাদ ও কৃপার বলেই উদ্বুদ্ধ হইয়া গ্রন্থকার এই গ্রন্থ রচনা করিয়াছেন। আজ তিন বৎসর যাবৎ তিনি “অনন্ত বিজয়” নামক মাসিক পত্রিকার সম্পাদকের কাজ করিতেছেন। গ্রন্থকারের কনিষ্ঠ ভ্রাতা শ্রীমান শ্যামানন্দও উচ্চশিক্ষিত যুবক।
গ্রন্থের শেষভাগে গ্রন্থকার “শ্রীশ্রীগুরুচাঁদ তত্বামৃতসার” নামে একটি নাতিদীর্ঘ অধ্যায় যোজনা করিয়া দিয়াছেন। উহার মধ্যে অতি সংক্ষেপে শ্রীশ্রীগুরুচাঁদ চরিতের সমস্ত সারতত্ত্বগুলি সন্নিবেশ করা হইয়াছে। বিশেষতঃ এই অংশে শ্রীশ্রীগুরুচাঁদের প্রচারিত মতুয়া-নীতিসমূহের একত্র সমাবেশ করা হইয়াছে। ইহাতে সংক্ষেপে ভক্তগণের পক্ষে সমস্ত নীতিগুলি মনে রাখিবার সুবিধা হইয়াছে। মতুয়া মহাসংঘের অতীত ও বর্তমান কতিপয় প্রধান প্রধান ভক্তের জীবন কাহিনী এবং তাহারা স্থীয় স্বীয় জীবনে কোনভাবে শ্রীশ্রীগুরুচাঁদকে উপলদ্ধি করিয়াছিলেন তাহার বিবরণ ও এই গ্রন্থে দেওয়া হইয়াছে। মহাপুরুষ রামকান্ত গোস্বামী সেবিত শ্রীশ্রীবাসুদেব জীউর, যুগাবতার শ্রীশ্রীহরিচাঁদ ঠাকুরের শ্রীশ্রীগুরুচাঁদ ও তদীয়া সহধর্মিনী সতী-স্বরূপিণী শ্রীশ্রীসত্যভামা দেবীর, মহাত্মা শশিভূষণ ঠাকুর ও তদীয় সাধ্বী পত্নী ও তাঁহাদিগের পুত্রদিগের অতীত ও বর্তমান মতুয়া মহাত্মা যাহাদিগের ছবি যাহা পাওয়া গিয়াছে তাহাদিগের শ্রীশ্রীগুরুচাঁদের কর্মজীবনের সঙ্গী ডক্টর মীডের ও গ্রন্থকারের ছবি এই গ্রন্থ মধ্যে সন্নিবিষ্ট হইয়াছে। বর্তমানে কাগজ ও অন্যান্য আবশ্যক দ্রব্যাদির দুর্মল্যতাহেতু গ্রন্থের মূল্য দশ টাকা মাত্র করা হইল। ৬০২ পৃষ্ঠার একখানি গ্রন্থের পক্ষে এই মূল্য কিছুতেই অধিক হয় নাই বলিয়া আমার দৃঢ় বিশ্বাস।
পরিশেষে নিবেদন এই যে, এই গ্রন্থ মুদ্রণের সমস্ত ব্যয় মতুয়া মহাসংঘ বহন করিয়াছেন। মতুয়া মহাসংঘের কতিপয় উদারহৃদয় ভক্ত যথেষ্ট অর্থদান করিয়া এই শুভকার্যে আনুকূল্য প্রকাশ করিয়াছেন; এবং অন্যান্য বহুভক্ত সাধ্যানুযায়ী কম বেশী পরিমাণে অর্থ সাহায্য করিয়াছেন। এই জন্য মতুয়া মহাসংঘের পক্ষ হইতে তাহাদিগকে আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করিতেছি। এই গ্রন্থের সমস্ত স্বত্বাধিকার মতুয়া মহাসংঘের অধিপতি হিসাবে এবং উক্ত সংঘের পক্ষে শ্রীশ্রীপ্রমথরঞ্জন ঠাকুর এম.এ. ব্যারিষ্টার-এ্যাট-ল., এম.এল.এ মহোদয়ের উপর বর্তিল। অতঃপর আশা করা যায় ভক্তগণ ও সর্বসাধারণ পাঠকবর্গ অত্র গ্রন্থখানি পাঠ করিয়া শান্তিলাভ করিবেন। ইতি-
শ্রীশ্রীহরি-গুরুচাঁদ কী জয়!!!
শ্রীশ্রীহরি-গুরুচাঁদ আশ্রম
(কলবাড়ী) খুলনা বিনীত নিবেদক -
৩০শে জ্যৈষ্ঠ ১৩২ ঠাকুরাব্দ শ্রীকুমুদরঞ্জন মজুমদার
১৩৫০ বঙ্গাব্দ