ভূমিকা
জাগ্রত চেতনা: দেখি, শুনি, পড়ি, জানি – মননে-বচনে-কর্মে সমাজ জাগরণ
ভূমিকা
আচার্য মহানন্দ হালদার রচিত “শ্রীশ্রীগুরুচাঁদ চরিত” একখানি আকর গ্রন্থ এবং মতুয়া ভক্ত সম্প্রদায়ের জীবনবেদ। সেই সঙ্গে এই গ্রন্থখানি বাংলার অনুন্নত শ্রেণীর মানুষের মুক্তি সংগ্রামের এক মহাভাষ্য। উনবিংশ শতকের সাতের দশক থেকে বিংশ শতকের তিনের দশক (১৮৭০ খ্রি.-১৯৩৭ খ্রি.) পর্যন্ত বাংলার অনুন্নত শ্রেণীর মানুষের ধর্ম-কর্ম, সমাজ-সংস্কৃতি এবং অর্থনীতি-রাজনীতির মেলবন্ধনে এক নূতন যুগের অভ্যুদয় এবং তাদের মুক্তি সংগ্রামের ঐতিহাসিক পটভূমিকায় যুগনায়ক শ্রীশ্রীগুরুচাঁদ ঠাকুরের বিরাট ভূমিকার এক উজ্জ্বল নিদর্শন আলোচ্য গ্রন্থখানির মধ্যে ফুটে উঠেছে এবং তা’ বর্তমান যুগের বাংলার দলিত-পতিত, নিঃস্ব ও নিপীড়িত মানুষের জীবনের এক মূল্যবান সম্পদ। ইতিপূর্বে তাদের কোন ইতিহাস লেখা হয়নি। “শ্রীশ্রীগুরুচাঁদ চরিত” গ্রন্থখানির মধ্যে সেই সব হারিয়ে যাওয়া কিছু তথ্য তুলে ধরা হয়েছে এবং সেই সঙ্গে যুগনায়ক শ্রীশ্রীগুরুচাঁদ ঠাকুরের মহাজীবনের যে ধারাভাষ্য রচিত হয়েছে তা সমাজ বিবর্তনের ইতিহাসে বিশেষ মূল্যবান।
মধাযুগীয় বাংলার সামাজিক ইতিহাস একান্তভাবে অন্ধকারাচ্ছন্ন। সুপ্রাচীন কাল হতে বাংলা ছিল কৌমধর্মী চণ্ডালভূমি। এখানকার আদি অধিবাসীরা ছিল চিরদিন উদার গণতান্ত্রিক সাম্যে বিশ্বাসী এবং মানব ধর্মের প্রবক্তা। কিন্তু আর্যাবর্তের ব্রাহ্মণ্য ও বৌদ্ধ ধর্মাবলীম্বীরা বাংলার এই কৌমধর্মকে কোনদিন ধর্ম হিসাবে স্বীকৃতি দিত না এবং তারা গণতান্ত্রিক সাম্যে বিশ্বাসীও ছিল না। তাই তাদের নিকট বাংলার মানুষ ছিল ধর্মহীন। এই ধর্মহীনদের সমুচিত শাস্তি দেওয়ার জন্য বৌদ্ধ ও ব্রাহ্মণ্যবাদীরা রাজশক্তির সহায়তায় বাংলা দখল করার এক উন্মত্ত খেলায় লিপ্ত হয়। তাই বৌদ্ধরা সর্ব প্রথমে বাংলার সিংহাসন দখল করে। আবার বৌদ্ধদের এখান থেকে হঠাবার জন্য ব্রাহ্মণ্যবাদীরা ষড়যন্ত্র করে বাংলার সিংহাসন দখল করে। অন্যদিকে ব্রাহ্মণ্যবাদীদের বাংলা থেকে বিতাড়িত করার জন্য বৌদ্ধরা বাংলায় মুসলমানদের ডেকে আনে, এ সম্পর্কে “শ্রীশ্রীগুরুচাঁদ চরিত” গ্রন্থে উল্লেখ আছে-
রাজদ্বারে চাটুকার, সেজে রহে অতঃপর,
রাজধর্ম নিজ ধর্ম কহে।
রাজা যবে বৌদ্ধ হয়, ব্রাহ্মাণ কি বাদ যায়,
রাজাজ্ঞায় বৌদ্ধ সাজি রহে।।
বঙ্গভূমে ঘটে তাই, বৌদ্ধ ছাড়া কেহ নাই,
পরে যবে হিন্দু রাজা হয়।
যতেক ব্রাহ্মণ ছিল, পুনরায় হিন্দু হ’ল,
কেহ কেহ পূর্বভাবে রয়।।
ইতিহাসের তুলনামূলক আলোচনা করলে এই সত্য প্রতিভাত হয়। আর এই বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীরা রাজশক্তির প্রশ্রয়ে এখানকার আদি অধিবাসী চণ্ডালদের উপর অকথ্য নির্যাতন চালিয়ে তাদের একস্থান হতে অন্যস্থানে বিতাড়িত করেছিল এবং স্ব স্ব ধর্মে ধর্মান্তরিত করার এক জঘন্য চক্রান্তে লিপ্ত হয়েছিল। আর্যাবর্তের এই সব ধর্মগুলি ভোগ বাসনার মূর্ত প্রতীক। রাজশক্তির প্রশ্রয় ছাড়া এই সব ধর্মের কোন প্রকার বাড়-বাড়ন্ত নেই। ফলে তারা কোনদিন সাম্য বা গণতন্ত্রের পূজারী নয়। বৌদ্ধরা বাংলার এই সব মাছ মাংস ভক্ষণকারী আদি অধিবাসীদের চণ্ডাল বলে গালি-গালাজ করত। অন্যদিকে ব্রাহ্মণ্য ধর্মাবলম্বীরা তাদের দস্যু, তস্কর, চোর বা বায়াংসি বলে অভিহিত করত। পরবর্তীকালে ইসলাম ধর্মাবলম্বীরা ব্রাহ্মণ্য ধর্মীদের মদতে বাংলার চণ্ডালদের উপর অকথ্য অত্যাচার ও শোষণ চালিয়ে তাদের ধর্মান্তরিত করত। তাদের একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল ধর্মান্তকরণ। সুতরাং চণ্ডালভূমি বাংলা ছিল ধর্মান্তকরণের পীঠভূমি। বাংলায় ব্রাহ্মণ্যধর্মীদের অত্যাচারের ফলে দলে দলে চণ্ডালেরা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করতে থাকে। দেশের এই সংকটকালে মহাপ্রভু চৈতন্যদেব তাদের ধর্মান্তকরণ রোধ করার জন্য উদাত্ত আহ্বান জানান।
চণ্ডালোপি দ্বিজ শ্রেষ্ঠ,
হরিভক্তি পরায়ণঃ।
কিন্তু সেই হরিভক্তির প্রেম প্লাবনে তিনি বাংলার চণ্ডালদের ভাসিয়ে নিতে পারেননি। তাই মহাপ্রভু চৈতন্যদেবের তিরোধানের পরে আবার ইসলাম রাজশক্তির সহায়তায় ব্রাহ্মণ্যধর্মাবলম্বীরা সেই চণ্ডালদের উপর অকথ্য অত্যাচার, নির্যাতন ও শোষণ শুরু করে। ফলে চণ্ডালেরা রিক্ত, নিঃস্ব ও সর্বহারা হয়ে পড়ে। তাদের মর্মভেদী হাহাকার ও ক্রন্দনে দেশের আকাশ-বাতাস সমাচ্ছাদিত হয়ে ওঠে। তার ফলে গোলোকবিহারী শ্রীহরির আসন টলে উঠল, তাই তাদের মর্মভেদী হাহাকার ও ক্রন্দনের মানবিক রূপ প্রদানের জন্য এবং সমাজ জীবনে পুনঃ প্রতিষ্ঠার জন্য স্বয়ং গোলোকবিহারী শ্রীহরির মর্ত-আগমন আসন্ন হয়ে ওঠে। তিনি মর্তলোকে দীন-দুঃখী, অন্ত্যজ বা অস্পৃশ্য এবং বহুযুগব্যাপী নিষ্পেষিত চণ্ডালদের ভগ্ন কুটিরে পূর্ণব্রহ্ম শ্রীশ্রীহরিচাঁদ ঠাকুর রূপে অবতীর্ণ হলেন।
উনবিংশ শতকের উষালগ্নে বাংলায় ব্রাহ্মণ্যবাদী হিন্দুধর্মের চরম অবক্ষয়, ধর্মের নামে নানা অত্যাচার অবিচার, ব্যভিচার, ভ্রষ্টাচার এবং ভেদবৈষম্যের ফলে দেশব্যাপী এক চরম শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছিল। এত বড় অবক্ষয় সারা ভারতবর্ষে কদাচিৎ দেখা গেছে। তথাকথিত ব্রাহ্মণ গুরুর দেওয়া ভুলমন্ত্র ও কুসংস্কার মানবজীবনের কোন ইষ্ট সাধন করতে পারে না। অন্যদিকে বৈষ্ণব ধর্মের মধ্যেও জলফেলা, ফোঁটা-কাটা ও তাদের বিভিন্ন কুসংস্কার মানুষকে এক কদর্য জীবনযাপনে বাধ্য করছিল। দেশের এই সার্বিক দুরাবস্থায় পূর্ণব্রহ্ম শ্রীশ্রীহরিচাঁদ ঠাকুর বৈষ্ণব এবং ব্রাহ্মণ্যবাদী হিন্দু ধর্মের বিরুদ্ধে কার্যতঃ বিদ্রোহই ঘোষণা করেছিলেন। সেই সঙ্গে সমাজের প্রতিভূ ব্রাহ্মণ জমিদার, নায়েব, গোমস্তাদের অত্যাচার ও অবিচারের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করেছিলেন। তার ফলে অত্যাচারিত ও নির্যাতিত চণ্ডালেরা দলে দলে তাঁর পাশে এসে দাঁড়াতে লাগল। তিনি যুগ চেতনার উর্ধে দাঁড়িয়ে, তিনি আশাহত সর্বহারা চণ্ডালদের পাশে দাঁড়িয়ে তাদের মাভৈঃ বাণী শুনিয়েছিলেন এবং এ সব ধর্মহীন চণ্ডালদের নিজস্ব ধর্ম “মতুয়াধর্ম” দিয়ে জাতি বা সম্প্রদায় গড়ে দিয়েছিলেন। ধর্ম জাতি বা সম্প্রদায় গড়ে দেয়। জাতি বা সম্প্রদায় কোনদিন ধর্ম গড়ে না। কেন না, ধর্মের মাধ্যমে মানুষের পরিচয় সুতরাং তিনি ধর্মহীন বাঙ্গালীর বৃহত্তর অংশের মানুষকে নিজস্ব ধর্ম দিয়ে তাদের ধর্মান্তকরণ রোধ করেছিলেন। পূর্ণব্রহ্ম শ্রীশ্রীহরিচাঁদ ঠাকুর অত্যন্ত বাস্তব সম্মতভাবে সর্বপ্রথমে চণ্ডালদের শান্তিপূর্ণ গার্হস্থ জীবন সুবিন্যস্ত করে তোলার জন্য, তাদের জমির অধিকারকে বৈধতা দেওয়ার জন্য জমিদার, নায়েব-গোমস্তাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করেন। তাঁর জোনাসুর কুঠির নীলকর ডিক সাহেব কুঠিতে অভিযান এক ঐতিহাসিক ঘটনা। এই জন্য তিনি ধর্মের মাধ্যমে চণ্ডালদের ঐক্যবদ্ধ শক্তি গড়ে তুলে তাদের আন্দোলনমুখী করে তুলেছিলেন।
ধর্মের এই ঐক্যবদ্ধ শক্তির উপর দাঁড়িয়ে মহাকালরূপী মহাদেব শ্রীশ্রীগুরুচাঁদ ঠাকুর দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ পতিত তথা অনুন্নত শ্রেণীর মানুষের কর্মজগতের চির অবরুদ্ধ দ্বার উন্মোচিত করার জন্য মতুয়াদের নিয়ে দ্বিতীয় পর্যায়ের আন্দোলন শুরু করেছিলেন। সর্বপ্রথমে তিনি পিতা পূর্ণব্রহ্ম শ্রীশ্রীহরিচাঁদ ঠাকুরের নির্দেশিত পথে বাংলার অনুন্নত শ্রেণীর মানুষের মধ্যে শিক্ষা আন্দোলন শুরু করেছিলেন। এই সময়ে বাংলার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিতে অস্পৃশ্য তথা অন্ত্যজ শ্রেণীর ছেলে মেয়েদের লেখাপড়ার কোন সুযোগ-সুবিধা ছিল না।
অনুন্নত জাতি মাঝে শিক্ষা প্রচারিতে।
আজ্ঞা করে হরিচাঁদ তারে বিধিমতে।।
তাই যুগনায়ক শ্রীশ্রীগুরুচাঁদ ঠাকুর এই ঐক্যবদ্ধ মতুয়া শক্তিকে দিয়ে দেশব্যাপী শিক্ষা আন্দোলন শুরু করেন। ১৮৭২ খ্রিষ্টাব্দে এই সার্বিক শিক্ষার দাবীতে বাংলায় চণ্ডাল বিদ্রোহ হয়। এই বিদ্রোহের ফলে অনুন্নত শ্রেণীর মানুষকে নিজেদের উদ্যোগে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার আহ্বান জানান হয়। যুগনায়ক শ্রীশ্রীগুরুচাঁদ ঠাকুরের সোজা কথা-
“খাও বা না খাও,
ছেলে-পুলে লেখাপড়া শিখাও”।
তিনি মতুয়াভক্তদের ডেকে ডেকে বলতে লাগলেন-
উচ্চ বিদ্যালয় যদি করিতে না পার।
যাহা পার তাহা কর কাজে কেন হার।।
আমি বলি মধ্য বাংলা কি মধ্য ইংরাজী।
স্কুল কর, স্কুল কর কথা সোজাসুজি।।
এই জন্য তিনি বাংলার প্রত্যন্ত গ্রাম-গঞ্জে গিয়ে সভা-সমিতি করতে লাগলেন। তাঁরই প্রচেষ্টায় ১৮৮০ খ্রিষ্টাব্দের জানুয়ারী মাসে ওড়াকান্দী গ্রামে সর্বপ্রথম পাঠশালা গড়ে ওঠে।
বারশ’ সাতাশী সালে অঘ্রান মাসেতে।
পাঠশালা হ’ল সৃষ্টি চৌধুরী বাটীতে।।
একেত’ পণ্ডিত সাধু রঘুনাথ নাম।
তাহে শক্তি দিল গুরুচাঁদ গুণধাম।।
দলে দলে ছাত্র আসি সকলে জুটিল।
অন্ধকার মাঝে যেন আলোক ফুটিল।।
যুগনায়ক শ্রীশ্রীগুরুচাঁদ ঠাকুরের এই শিক্ষা আন্দোলনের ফলে বাংলার অনুন্নত শ্রেণীর মানুষের মধ্যে এক নবজাগরণের সৃষ্টি হ’ল। তাঁরই নির্দেশে মতুয়া ভক্তেরা প্রতি জিলায় এই শিক্ষা আন্দোলনকে ছড়িয়ে দিতে লাগল।
তাই ভক্তগণে বলে গুরুচাঁদ প্রভু।
শিক্ষা নিতে অলসতা করিওনা কভু।।
বলা মাত্র স্রোত চলে প্রতি জেলা জেলা।
কে জানে কি ভাবে প্রভু করে লীলা খেলা।।
তারপর হতেই বাংলার অনুন্নত শ্রেণী অধ্যুষিত গ্রামে-গঞ্জে পাঠশালা, মধ্য ইংরাজী ও উচ্চ ইংরাজী বিদ্যালয় গড়ে উঠতে লাগল। একটি চিরনিদ্রিত-একটি চিরবঞ্চিত মানব গোষ্ঠীকে সামাজিক পঙ্ককুণ্ড থেকে টেনে তুলবার জন্য যুগনায়ক শ্রীশ্রীহরি-গুরুচাঁদ যে কি কঠোর পরিশ্রম করেছিলেন তা কোন দেহধারী মানুষের পক্ষে সম্ভব ছিল না। একমাত্র ভগবানের পক্ষে তা সম্ভব। শ্রীশ্রীহরি-গুরচাঁদ ঠাকুরই মানুষের ভগবান। তাঁদের দ্বৈতসাধনায় একটি চিরনিদ্রিত, নিঃস্ব ও নিপীড়িত মানব গোষ্ঠী বহু যুগের জড়তা, অবসাদ ও নিদ্রা ভেঙ্গে কিভাবে জেগে উঠেছিল এবং ধর্ম ও কর্মের পথ প্রশস্ত করেছিল তা আজ ভাবলে বিস্মিত হতে হয়। যুগনায়ক শ্রীশ্রীগুরুচাঁদ ঠাকুর দেশের সমস্ত নিঃস্ব নিপীড়িত মানুষকে প্রায়ই ডেকে ডেকে বলতেন-
বিদ্যার অভাবে, অন্ধ হয়ে সবে,
অন্ধকারে আছে পড়ে।
জ্বেলে দাও আলো, মোহ দূরে ফেল,
আঁধার ছুটিবে দূরে।।
দেশের নিঃস্ব-নিপীড়িত অনুন্নত শ্রেণীর অস্পৃশ্য মানুষের কুটিরে আলো জ্বেলে দাও। এক আলোর শিখা থেকে সহস্র আলো শিখা জ্বলে উঠবে। চারিদিক হয়ে উঠবে উদ্ভাসিত। অন্ধকারের বুকে জ্বলে উঠবে সহস্র সহস্র আলোক বর্তিকা। হাজার বছরের জড়তা মুছে ফেলে জেগে উঠবে এক নূতন মানব সম্প্রদায়। তাই উনবিংশ শতকের শেষলগ্নের মধ্যে যুগনায়ক শ্রীশ্রীগুরচাঁদ ঠাকুরের প্রচেষ্টায় বাংলার অনুন্নত শ্রেণী অধ্যুষিত গ্রাম-গঞ্জে দেড় হাজারের উপরে বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। দেশের এই অবহেলিত ও অবদমিত জাতি বা সম্প্রদায়গুলিকে জাগাবার জন্য ভারতবর্ষে এমন কোন প্রতিষ্ঠিত সমাজ সংস্কারক, শিক্ষাবিদ, রাজনৈতিক নেতা নেই- যিনি পাঁচ/ সাতটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সৃষ্টি করে নজির গড়ে তুলেছিলেন। এত বড় যার অবদান- দেশের জন্য এত বড় যার ত্যাগ স্বীকার- স্বাধীন ভারতবর্ষের বর্ণবাদী সমাজ তার মূল্যায়ন করতে একান্ত নারাজ। অথচ খ্রিস্টান মিশনারী ডঃ সি. এস. সীড তাঁর সম্পর্কে লিখেছিলেন-
“Guru Charan Babu is a leader of outstanding ability and of wide-spread influence. In the various activities of my missionary life he has made possible many things that without his backing could not have been carried through. With a liberality of thought, a courage and a foresightedness uncomman among men of the older orthodax school. He has sought the up lift of great namasudra caste.”
১৯০৬ খ্রিষ্টাব্দের প্রথম দিকে যুগনায়ক শ্রীশ্রীগুরুচাঁদ ঠাকুর ডঃ সি. এস. মীডের সহায়তায় তৎকালীন পূর্ববঙ্গ ও আসামের লেফটন্যান্ট গভর্নর স্যার ল্যান্সলট হেয়ারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। সেই সাক্ষাৎকারে তিনি বাংলার পতিত তথা চণ্ডালদের শিক্ষা ও চাকুরী-সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরেন। এই সাক্ষাৎকারের পরে স্যার ল্যান্সলট হেয়ার একমাত্র সাবেক চণ্ডাল জাতি অধুনা নমঃশূদ্রদের শিক্ষা ও চাকুরীতে বিশেষ সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার কথা ঘোষণা করেন।
এহেন প্রকারে, লাট দরবারে,
পতিতেরে দিল গতি।।
হ’ল জাগরণ, নমঃ শূদ্রগণ,
রাজকার্য পায় বঙ্গে।
যুগনায়ক শ্রীশ্রীগুরুচাঁদ ঠাকুরের নেতৃত্বে সাবেক চণ্ডাল জাতি অধুনা নমঃশূদ্র সম্প্রদায়ের শিক্ষিত যুবকদের চাকুরীতে নিয়োগের দাবীতে উক্ত সাক্ষাৎকারে ব্যবস্থা হয়েছিল। পূর্বে সরকারী চাকুরীতে তাদের নিয়োগের কোন সুযোগ সুবিধা ছিল না। কোন সরকারী অফিসে চাকুরীর জন্য গেলে তাদের অস্পৃশ্য চণ্ডাল বলে তাড়িয়ে দেওয়া হত। সাবেক চণ্ডাল জাতি এই সব সুযোগ-সুবিধার ফলে বাংলার অন্যান্য অনুন্নত সম্প্রদায়ের লোকেরাও অনুরূপ সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার পথ প্রশস্ত হয় এবং তাদের মধ্যেও মুক্তি সংগ্রামের গতিবেগ সঞ্চারিত হয়। তখনকার দিনে অন্যান্য অনুন্নত সম্প্রদায়ের লোকেরাও অস্পৃশ্য বা অন্ত্যজ বলে চিহ্নিত ছিল। ১৯০৬ খ্রীষ্টাব্দে ৩১শে অক্টোবর বাংলা প্রেসিডেন্সীর গভর্ণর স্যার ল্যান্সলট হেয়ার ভারতবর্ষের গভর্নর জেনারেল লর্ড মিন্টোর নিকট অনুন্নত শ্রেণীর লোকেদের উন্নয়নের জন্য একটি খসড়া প্রভাব পেশ করেন। সেই খসড়া প্রস্তাবানুসারে ১৯০৯ খ্রিষ্টাব্দে মর্লি-মিন্টো সংস্কার আইনে বাংলার ৩১টি অনুন্নত শ্রেণীর সম্প্রদায়কে শিক্ষা ও চাকুরীক্ষেত্রে বিশেষ সুযোগ-সুবিধা প্রদানের কথা ঘোষণা করা হয়। এই সংস্কারের আইনে বঙ্গীয় আইন সভায় অনুন্নত শ্রেণীর একজন নির্বাচিত এবং একজন মনোনীত প্রার্থীর থাকার ব্যবস্থা করা হয়। তখনও পর্যন্ত ভারতবর্ষের অন্যান্য প্রেসিডেন্সী বা প্রদেশে কোন বিশেষ সুযোগ-সুবিধা বা সংরক্ষণ ব্যবস্থা চালু হয়নি। একমাত্র বাংলার এই ৩১টি সম্প্রদায়কে নিয়ে “বঙ্গীয় তপঃশীলভূক্ত জাতি” আইন সৃষ্টি হয়।
তপশীল জাতি মধ্যে যা’ কিছু হয়েছে।
হরিচাঁদ কল্পবৃক্ষে সকলি ফলেছে।।
হরি-কল্পবৃক্ষে ফলে সঞ্জীবনী ফল।
সে ফল বিলায় গুরু পরম দয়াল।।
সে গুরু পরম গুরু গুরুচাঁদ নাম।
শত কাশীতুল্য যার ওড়াকান্দী ধাম।।
কেন হেন হ’ল কেন জাগিয়াছে জাতি?
কে করেছে প্রাণ দান জেগে দিবা রাতি।।
আজ কেহ নাহি করে তাহার সন্ধান।
শুধু শুধু হ’ল নাকি সবে মান্যবান।।
অনুন্নত শ্রেণীর মানুষের শিক্ষা, চাকুরী ও আইন সভায় যে আসন সংরক্ষিত হয়েছিল, তার মূলে ছিলেন যুগনায়ক শ্রীশ্রীগুরুচাঁদ ঠাকুর এবং সংঘবদ্ধ মতুয়া আন্দোলন। ভারতবর্ষের মত বর্ণভিত্তিক বা সম্প্রদায় ভিত্তিক দেশে সংঘবদ্ধ আন্দোলন ছাড়া কোন দাবী আদায় করা যায় না।
১৯১১ খ্রিষ্টাব্দে লোকগণনায় বাংলার চণ্ডালদের নমঃশূদ্র সম্প্রদায় হিসাবে চিহ্নিত করা হয় এবং তাদের হাজার বৎসরের চণ্ডাল গালি মোচন করা হয়। এর মূলে ছিল যুগনায়ক শ্রীশ্রী গুরুচাঁদ ঠাকুরের সার্বিক প্রচেষ্টা। ১৯১২ খ্রিষ্টাব্দে যুক্তবঙ্গের গভর্নর লর্ড কারমাইকেলের নিকট তাঁর নেতৃত্বে এবং ডঃ সি. এস. মীডের সক্রিয় সহযোগিতায় আর একটি ডেপুটেশন দেওয়া হয়। এই ডেপুটেশনে বাংলার অনুন্নত শ্রেণীর জনগণের পক্ষ হতে শিক্ষা ও চাকুরীতে আরো বেশী সুযোগ-সুবিধা দাবী করা হয়। তাই ১৯১৩ খ্রিষ্টাব্দে শিক্ষা বিভাগের অধিকর্তার ঘোষণা অনুযায়ী পূর্ববঙ্গের তপশীলীভূক্ত জাতিসমূহের ছাত্রদের পড়াশুনার সুবিধার্থে কিছু সরকারী হোস্টেলের ব্যবস্থা করা হয়। তার মধ্যে ওড়াকান্দী, ঝালকাঠি, পিরোজপুর, বরিশাল এবং ঢাকায় সরকারী অর্থ সাহায্যে হোস্টেল চালু করা হয়। ১৯১৫ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে পূর্ববাংলার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এবং সরকারী অফিসে অনুন্নত শ্রেণীর মানুষের জন্য জনসংরক্ষণ ব্যবস্থা পুরোপুরি চালু হয়ে যায়। ১৯১৮ খ্রিষ্টাব্দে কলিকাতায় অনুরূপ একটি হোস্টেল খোলা হয় এবং তার পরিচালন ভার কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপর ন্যাস্ত হয়। ১৯১৯ খ্রিষ্টাব্দে মন্টেগু-চেমসফোর্ড সংস্কার আইনে অনুন্নত শ্রেণীর এই সংরক্ষণ ব্যবস্থা ভারতবর্ষের অন্যান্য প্রেসিডেলী বা প্রদেশে ছড়িয়ে দেওয়ার কথা ঘোষণা করা হয়। এই ভাবে যুগনায়ক শ্রীশ্রীগুরুচাঁদ ঠাকুরের নেতৃত্বে মতুয়া আন্দোলনের ফলে সমগ্র ভারতবর্ষের শিক্ষা, চাকুরী ও আইন সভায় সংরক্ষণ সৃষ্টি হয়। তিনি দিন-রাত জেগে কঠোর পরিশ্রম করে একটি পিছিয়ে পড়া চিরনিদ্রিত মানব গোষ্ঠীর মুক্তির পথ সুগম করে তুলেছিলেন। সুতরাং তারই অবিসাংবাদিত নেতৃত্বে যে আন্দোলন পূর্ববঙ্গে সংগঠিত হয়েছিল তা আজ সারাদেশে ফুলে-ফলে পল্লবিত। তাই আজ দেশের সর্বত্র অনুন্নত শ্রেণীর মানুষের মুক্তি আন্দোলনের শিক্ষা প্রজ্বলিত। উনবিংশ শতকের সাতের দশক থেকে বিংশ শতকের তিনের দশক পর্যন্ত যুগনায়ক শ্রীশ্রীগুরুচাঁদ ঠাকুর দেশের অনুন্নত শ্রেণীর মানুষের দাসত্ব মুক্তির প্রধান রূপকার এবং বিভিন্ন সমাজ-সংস্কারমূলক কার্যে আত্মনিবেদিত এক মহামানব। ১৯২৩ খ্রিষ্টাব্দে খুলনা শহরে “নিখিল বঙ্গ নমংশূদ্র সম্মেলন”-এ তিনি সভাপতিত্ব করেন।
এই সম্মেলন হ’তে, নমঃশূদ্র কোন পথে,
চালনা করিবে রাজনীতি।
যাহা বলে দয়াময়, সভামধ্যে পাঠ হয়
তাতে সবে জানা’ল সম্মতি।।
খুলনা শহরের সম্মেলনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১৯২৬ খ্রিষ্টাব্দে “দি বেঙ্গল ডিপ্রেণ্ড ক্লাসেস এ্যাসোসিয়েশন” গঠিত হয়।
বাংলার অধিকাংশ অনুন্নত শ্রেণীর মানুষ কৃষিজীবী। অন্যদিকে তাদের অধিকাংশের নিজস্ব চাষাবাদ যোগ্য জমি ছিল না। বর্ণহিন্দু জমিদার, জোতদার ও গাতিদারদের জমি তারা ভাগচাষ করত। পূর্ববাংলায় এই ভাগচাষী-আন্দোলনকারীরা অধিকাংশই ছিল যশোর, খুলনা ও ফরিদপুরের নমঃশূদ্র ভাগচাষী। আবার এই সব ভাগচাষী-কৃষকেরা ছিল মতুয়া ধর্মাবলম্বী। বাংলার অনুন্নত শ্রেণীর মানুষকে নিয়ে তিনি সামাজিক আন্দোলন শুরু করেছিলেন। যুগনায়ক শ্রীগুরুচাঁদ ঠাকুর মতুয়াদের ধর্মীয় সংগঠনের পাশাপাশি সামাজিক পরিবর্তনের এই আন্দোলন শুরু করেন। পূর্ববঙ্গে যশোর, খুলনা ও ফরিদপুর জেলার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে কৃষকদের উপর জমির সেস্ ধার্য করা হয়। বর্গা প্রথা চালু হওয়ার পর ধান-কড়ালি হিসাবে জমি বন্দোবস্ত দেওয়া হত। তার ফলে জমির খাজনাও বৃদ্ধি পায়। অন্যদিকে জমির বর্গাদারকে জমি চাষাবাদের জন্য কম ধান দেওয়া হত তাই জমি ভাগচাষী-বর্গাদারকে ফসলের কম ভাগ দেওয়া হত। ফলে কৃষকদের মধ্যে গভীর অসন্তোষ দেখা দেয়।
পাঁচ টাকা কর্জ করি কত অভাজন।
সুদের পাষাণ তলে ছেড়েছে জীবন।।
জমি গেছে জমা গেছে, গেছে অস্থাবর।
ঘর-হারা লক্ষ্মী-ছাড়া অবনী ভিতর।।
যুগনায়ক শ্রীশ্রীগুরুচাঁদ ঠাকুর বাংলার এই সব সর্বহারা কৃষকদের পাশে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। ১৯০০ খ্রিষ্টাব্দের প্রথম দিকে তার নেতৃত্বে কৃষকেরা তে-ভাগা আন্দোলন শুরু করে। ১৯২২ খ্রিষ্টাব্দের জুন মাসে বরিশাল জিলার পিরোজপুরে যুগনায়ক শ্রীশ্রীগুরুচাঁদ ঠাকুরের সভাপতিত্বে এক বিশাল কৃষক সমাবেশে সর্বপ্রথম আমূল ভূমি সংস্কারের দাবী তোলা হয়। বাংলার কৃষকদের বিভিন্ন দাবী-দাওয়া নিয়ে তিনি বিভিন্ন জেলায় সভা-সমিতি করেছিলেন। ১৯৩৩ খ্রিষ্টাব্দে মেদিনীপুরের ঘাটালে অনুষ্ঠিত বঙ্গীয় প্রাদেশিক কৃষক সম্মেলনে তিনি প্রধান বক্তা হিসাবে উপস্থিত ছিলেন। তাই যুগনায়ক শ্রীশ্রীগুরুচাঁদ ঠাকুরকে তে-ভাগা আন্দোলনের জনক বলা হয়। তিনি ছিলেন একজন কৃষক দরদী ও দরিদ্র মানুষের মুক্তি আন্দোলনের দিশারী।
মতুয়া ধর্ম হচ্ছে গৃহী মানুষের সার্বিক ধর্ম। এই ধর্মের কাজ হচ্ছে গৃহী মানুষের সার্বিক সুখ শান্তির দ্বার উন্মোচিত করা। মানুষের জীবনে শান্তি না থাকিলে তার সাংসারিক সুখ-সমৃদ্ধি আসে না। সুতরাং মানুষের মানসিক শান্তি আসল। তাই মতুয়া ধর্মাবলম্বীরা গৃহীর ধর্মপালন করে থাকে।
ধর্মনীতি, রাজনীতি গৃহস্থের নীতি।
সর্বনীতি দাতা গুরুচাঁদ বিশ্বপতি।।
প্রায় একশত পঁচিশ বৎসরব্যাপী শ্রীশ্রীহরি-গুরুচাঁদের দ্বৈত সত্ত্বার মিলিত রূপবাংলার চিরনিষ্পেষিত, শোষিত, বঞ্চিত এবং অবদমিত মানব সমাজকে মুক্তি সোপান তৈরী করে দিয়েছিলেন যা আজ পর্যন্ত ভারতবর্ষের কোন দলিত সমাজ সংস্কারক বা রাজনৈতিক নেতা করতে পারেননি। কিছু কিছু স্বার্থান্বেষী মানুষ প্রচার করে থাকে যে শ্রীশ্রীহরি-গুরুচাঁদ ঠাকুর একমাত্র চণ্ডাল অধুনা নমঃশূদ্র সম্প্রদায়কে মুক্তি দিতে এসেছিলেন। যারা এই ধরনের মিথ্যা তথ্য প্রচারে লিপ্ত তারা আর কিছু হোক না কেন- তারা মানুষের মঙ্গলকামী নয়। দেশে সংখ্যাগরিষ্ঠ অনুন্নত শ্রেণীর মানুষ সমাজে পতিত ও অস্পৃশ্য। তাদের সমাজের পঙ্ককুণ্ড থেকে টেনে তোলার জন্য শ্রীশ্রীহরি-গুরুচাঁদ ঠাকুর দিবা-রাত্রি যে ভাবে কঠোর পরিশ্রম করেছিলেন তা কোন দেহধারী মানুষের পক্ষে সম্ভব না। তাই তাঁরা সেই মনুষ্য দেহধারী ভগবান। তাঁরা হলেন হরি-হরের অভেদাত্মা। তাঁরা এই ধরাধামে অবতীর্ণ হয়েছিলেন সমস্ত পতিত তথা নিঃস্ব, নিপীড়িত ও শোষিত মানব সম্প্রদায়কে কৌলীন্যের বেড়াজাল থেকে মুক্তি দিতে। তাই তাঁরা কোন সম্প্রদায় বিশেষের জন্য নয়। প্রত্যেক দেহধারী অবতারকে কোন না কোন পরিবারে অবতীর্ণ হতে হয়। তাই বলে তাঁরা কি সেই পরিবার বা গোষ্ঠীর মুক্তির জন্য অবতীর্ণ হন? তাঁদের আদর্শ বা বাণী সর্বস্তরের মানুষের মঙ্গলের জন্য। বাংলার অন্যান্য অনুন্নত শ্রেণীর বিভিন্ন সম্প্রদায়ের বহু মানুষ মতুয়া ধর্মের পতাকা তলে আশ্রয় নিয়েছিল তা “শ্রীশ্রীহরিলীলামৃত” ও “শ্রীশ্রীগুরুচাঁদ চরিত” গ্রন্থদ্বয়ের মধ্যে বিবৃত হয়েছে।
ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রদেশে বা রাজ্যে যে সব অবতার বা মহামানব আবির্ভূত হয়েছিলেন- তাঁরা তো ভারতবর্ষের মতো কোন না কোন সম্প্রদায় বা পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেছিলেন। তাই বলে কি তাঁরা সেই সম্প্রদায়ের অবতার ছিলেন? তা যদি না হয় তাহলে শ্রীশ্রীহরি-গুরুচাঁদ ঠাকুরকে কেন বর্ণকৌলীন্যের ছাপ মেরে তাঁদের মানব কল্যাণের দিকগুলি উপেক্ষিত হবে? যে সব মানুষ এসব করে থাকে তারা মানব সমাজের চিরন্তন শত্রু।
যুগনায়ক শ্রীশ্রীগুরুচাঁদ ঠাকুর দ্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করেছিলেন-
নমঃশূদ্র কুলে জন্ম হয়েছে আমার।
তবু বলি আমি নহি নমঃর একার।।
দলিত পীড়িত যারা দুঃখে কাটে কাল।
ছুসনে ছুসনে বলে যত জল-চল।।
শিক্ষা হারা, দীক্ষা হারা ঘরে নাহি ধন।
এসবে জানি আমি আপনার জন।।
শ্রীশ্রীহরি-গুরুচাঁদ ঠাকুর এই ধরাধামে এসেছিলেন পতিত তথা অস্পৃশ্য বা অন্ত্যজ মানুষের সার্বিক দাসত্ব মুক্তির জন্য। তাঁরা চেয়েছিলেন বর্ণ-কৌলীন্যের বিলোপ করে জাতপাতহীন এক নূতন মানব সমাজ গড়তে। সুতরাং তাঁদের এই মুক্তি আন্দোলন কেবলমাত্র নমংশূদ্রদের মুক্তি আন্দোলন ছিল না। এ মুক্তি আন্দোলন যারা সমাজে দলিত-পতিত নির্যাতীত ও সর্বহারা মানুষ- যাদের শিক্ষা নেই, দীক্ষা নেই এবং চিরদরিদ্র- শ্রীশ্রীহরি-গুরুচাঁদ ঠাকুর তাদের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক দাসত্ব শৃঙ্খল ভেঙ্গে এক নব জাগ্রত দেশ গড়তে চেয়েছিলেন। তাই যুগনায়ক শ্রীশ্রীগুরুচাঁদ ঠাকুরের নিকট বাংলার সমস্ত পিছিয়ে পড়া অধিকার বঞ্চিত মানুষ এসে তাঁর অনুগামী হয়েছিল-
নমঃশূদ্র, তেলী, মালী আর কুম্ভকার।
কপালী, মাহিষ্য দাস, চামার-কামার।।
পোঁদ আসে, তাঁতী আসে, আসে মালাকার।
কতই মুসলমান আসে ঠিক নাহি তার।।
তৎকালীন বাংলায় উক্ত সম্প্রদায় গুলি ছিল অনুন্নত শ্রেণীভুক্ত এবং সমাজে অন্ত্যজ বা অস্পৃশ্য।
বারুজীবী কুলে জন্ম শ্রীমহেন্দ্র দাস।
ওড়াকান্দি-ভক্ত তার দশানীতে বাস।।
গোপালচাঁদের পদে দৃঢ় নিষ্ঠা রাখে।
জাতিকুল ছেড়ে দিয়ে প্রেমে মত্ত থাকে।।
এই ভাবে তৎকালীন বাংলার বহু পতিত তথা অন্ত্যজ বা অস্পৃশ্য সমাজের মানুষ মতুয়া আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল। তারা মতুয়া ভাবাদর্শ ও কর্মাদর্শ গ্রহণ করেছিল। এই একবিংশ শতকে অনুন্নত শ্রেণীর মানুষের যে সমুন্নতি তার মূলে এই মতুয়া ধর্ম আন্দোলন। কিন্তু কিছু বর্ণ-কৌলীন্যধারী এবং স্থার্থান্বেষী মানুষ মতুয়া ধর্মান্দোলনকে কেবলমাত্র নমঃশূদ্র সম্প্রদায়ের ধর্ম বলে প্রচার করতে সচেষ্ট। এই সব লোকেরা সমাজের প্রগতি বা মানব সমতার পরিপন্থী। এদের উদ্দেশ্য হচ্ছে যে পতিত বা অনুন্নত শ্রেণীর মানুষের মধ্যে বিভেদ বা বিভাজন সৃষ্টি করে অস্পৃশ্যতাকে জিইয়ে রাখা। এই সব মানুষ মুখে বড় বড় সাম্যবাদ বা গণতন্ত্রের অসার বুলি উদগীরণ করে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করতে তৎপর। আবার অনুন্নত শ্রেণীর কিছু স্বার্থান্বেষী মানুষ মতুয়া আন্দোলনের সুফল ভোগ করে উচ্চশিক্ষিত হয়েছে তারা মতুয়াদের হেয় প্রতিপন্ন করে মতুয়া আন্দোলনকে স্বীকার করতে চায় না। এদের মত অকৃতজ্ঞ এবং নরাধম কদাচিত দেখা যায়। এরা উপকারীর উপকার স্বীকার করে না।
মতুয়া সম্প্রদায়ের লোকেরাই একমাত্র গণতন্ত্র বা সাম্যবাদের পূজারী এবং তারাই সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে ভেদ বৈষম্যের অবসান ঘটিয়ে এক নূতন মানব সমাজ গড়তে চায়। তারা এমন সমাজ গড়তে চায় যেখানে থাকবে না কোন ভেদ-বৈষম্য, যেখানে থাকবে না কোন অস্পৃশ্যতা- সমাজের প্রতিটি লোক প্রতিটি লোককে ধরে রাখবে- যাতে দেশের দরিদ্রতম ব্যক্তিও সমাজকে নিজের বলে মনে করতে পারবে এবং সব সম্প্রদায়ের মানুষ পূর্ণ ঐক্যবোধের মর্যাদায় বসবাস করবে। প্রতিটি গৃহে থাকবে মানুষের মনের শান্তি। মানুষ হবে গৃহী সন্ন্যাসী। ত্যাগ ও ভোগের সমন্বয়ে মানুষ হবে এক মূল্যবোধের অধিকারী। এই আধ্যাত্মিক চেতনা ও লৌকিক মূল্যবোধই মানুষকে দেখাবে ভবসংসারের পাথেয়। এটাই মতুয়া ধর্মের মূল আদর্শ। তাই যুগনায়ক শ্রীশ্রীগুরুচাঁদ ঠাকুরের ভবিষ্যদ্বাণী-
যেই শক্তি হরিচাঁদ দিয়ে গেছে সবে।
সেই শক্তি হিন্দুগণে গ্রহণ করিবে।।
সর্বজাতি সমন্বয় হবে তাঁর মতে।
ভাই-ভাই হয়ে সব চলিবে সে পথে।।
ভোগ মানুষকে শান্তি দিতে পারে না। এ ভবসংসারে সব কিছুই অসার। মানব জীবনে একমাত্র পূর্ণতার পথে এগোতে হলে চাই মানসিক শান্তি। সেজন্য মানুষকে সেই পূর্ণতার পথে এগোতে হলে “হাতে কাম, মুখে নাম এবং দিল খোলা হতে হবে” তা হলে মানবিক পূর্ণতার পথে পৌছান সম্ভব। তার জন্য সৃষ্টি ও প্রলয়ের মধ্যে যোগসাধন ঘটানো প্রয়োজন। তা হলে সৃষ্টি ও স্থিতির মেল বন্ধনে পূর্ণতার অভিসার। সুতরাং ধর্মই কর্ম, কর্মই ধর্ম। এর মধ্যে গৃহী মানুষের জীবনের সুখ-শান্তি নিহিত। তাই গৃহের পবিত্রতা রক্ষা করার মধ্যে ঈম্বর ও মানুষ, ত্যাগ ও ভোগের মধ্যে গৃহাশ্রম গড়ে ওঠে। সাংসারিক কর্ম ও ধর্ম পালন করার মধ্যে সমাজ ও রাষ্ট্রের কল্যাণ সাধিত হয়। দেশে আদর্শ প্রশস্ত গার্হস্থ্য ধর্ম ও কর্ম প্রতিষ্ঠাই শ্রীশ্রীহরি-গুরুচাঁদ ঠাকুরের অভিপ্রায় এবং মতুয়া ধর্মের মূল উদ্দেশ্য সুবিন্যস্ত। এত বড় অকুণ্ঠ মানব প্রেম সচরাচর দেখা যায় না।
সর্বশেষে মতুয়া মহাসংঘাধিপতি শ্রীকপিল কৃষ্ণ ঠাকুর আচার্য মহানন্দ হালদারের “শ্রীশ্রীগুরুচাঁদ চরিত” গ্রন্থের ভূমিকা লেখার দায়িত্ব আমার উপর অর্পণ করেছেন। এই মহাগ্রন্থের ভূমিকা লেখা আমার পক্ষে ধৃষ্টতা মাত্র। তথাপি তাঁর দাবী এই ভূমিকার মধ্যে কতটুকু রক্ষা করতে পেরেছি তা সুধী পাঠক ভক্তবৃন্দ এবং গবেষকগণ বিচার করবেন। তবে এই মহাগ্রন্থের ভূমিকা লিখতে পেরে আমি জীবনে ধন্য, আমি কৃতার্থ। ওঁ শ্রীহরি-গুরুচাঁদ।।
তারিখ: ৩০-৩-২০০৩ শ্রীপরমানন্দ হালদার,
শ্রীধাম ঠাকুরনগর, (ড. পরমানন্দ হালদার)
জেলা-উত্তর ২৪ পরগণা, প্রাক্তন রিডার,
পশ্চিমবঙ্গ। বাংলা বিভাগ।
গোবরডাঙ্গা হিন্দু কলেজ।
জেলা: উত্তর ২৪ পরগণা।