বারুণীর উৎপত্তি
জাগ্রত চেতনা: দেখি, শুনি, পড়ি, জানি – মননে-বচনে-কর্মে সমাজ জাগরণ
বারুণীর উৎপত্তি
ভক্তগণ চরণেতে করি নিবেদন।
বারুণীর জন্ম কথা করিব বর্ণন।।
একদিন ব্রহ্মলোকে দুর্বাশা চলিল।
যোগ বলে ব্রহ্মলোকে উপনীত হল।।
তুষ্ট হল ব্রহ্মাদেব মুনিকে দেখিয়া।
তুষিলেন পারিজাত পুষ্পমালা দিয়া।।
বলিলেন এই মালা যার গলে দেবে।
............একটা লাইন নাই
মালা লয়ে মুনিবর গেল স্বর্ণ পুরি।
দেবরাজে দিল মালা উপহার করি।।
মালা দিল দেবরাজ পরি রয় গলে।
শুণ্ডেতে ছিড়িয়া মালা ভুমি তলে ফেলে।।
মনে মনে দুর্বাশার হলো অপমান।
ক্রোধেতে কম্পিত মুনি হারাইল জ্ঞান।।
শাপ দিল ইন্দ্র দেবে ছন্ন হয়ে মতি।
লক্ষ্মী ভ্রষ্ট হবে তব এ অমরাবতী।।
অভিশপ্ত হয়ে লক্ষ্মী গেলেন ছাড়িয়া।
সমুদ্র মাঝারে লক্ষ্মী লুকাইল গিয়া।।
লক্ষ্মী ছাড়া হল যদি অমরা ভুবন।
লক্ষ্মীর বিরহে তবে শোকাকুল মন।।
অমঙ্গল দেখা দিল স্বর্গের মাঝারে।
দেবগণ ক্ষুন্ন মন সদা আঁখি ঝরে।।
কি করিব কোথা যাব না দেখি উপায়।
ডাকিতে লাগিল তুমি কোথা দয়াময়।।
দেবতার দুঃখ হেরী প্রভু নারায়ন।
আসিয়া দিলেন দেখা শ্রী মধুসূদন।।
প্রভু বলে শুন শুন যত দেবগণ।
লক্ষ্মী প্রিয়া হারাইয়া কান্দে মম মন।।
তোমাদের দুঃখ যাহা মম দুঃখ তাই।
লক্ষ্মীর উদ্ধার কথা সবাকে জানাই।।
লক্ষ্মী আছে লুকাইয়া সমুদ্র মাঝারে।
মথিব সমুদ্র আজ কহিনু সবারে।।
সমুদ্র মন্থন করি লক্ষ্মী ফিরে পাব।
পুনঃরূপী লক্ষ্মী এনে স্বর্গেতে বসাব।।
আর এক কার্য হবে সমুদ্র মন্থনে।
কহিলাম সার কথা শুন সর্ব্বজনে।।
অমৃতের ভাণ্ড আছে ক্ষীরোদের জলে।
অমর হইবে সবে অমৃত খাইলে।।
এত যদি কহিলেন প্রভু নারায়ন।
সন্তুষ্ট হইয়া বলে যত দেবগণ।।
তুমি প্রভু নারায়ন অখিলের পতি।
তুমি বিনে আমাদের নাহি কোন গতি।।
সমুদ্র মন্থন করি যদি পাই সুধা।
জনমের তরে দূরে যাবে ভব ক্ষুধা।।
কেমনে করিব মোরা সমুদ্র মন্থন।
তাহার বৃত্তান্ত কথা কহ নারায়ন।।
নারায়ন বলে শুন যত দেবগণ।
সমুদ্র মন্থন কথা কহিব এখন।।
মন্দন পর্ব্বত আছে পৃথিবী মাঝারে।
আনিবে পর্ব্বত খানি উত্তোলন করে।।
রাখিবে পর্ব্বত খানি সমুদ্র ভিতর।
বাসুকিরে রজ্জু করি মথিবে সাগর।।
তোমাদের শক্তি নাই পর্ব্বত আনিতে।
অসুর গণেরে ডাকি লইবে সঙ্গেতে।।
অসুরেরা শক্তিশালী পৃথিবী মাঝার।
থাকিলে তাহারা সঙ্গে হইবে উদ্ধার।।
দেবরাজ ইন্দ্র বলে শুন নারায়ন।
দৈত্যগণ চিরশত্রু কি করি এখন?
ইন্দ্রের শুনিয়া কথা কহে নারায়ন।
মিত্রতা করিয়া কর কার্য সমাপণ।।
তাহাদের বলিবেক সরল ভাষায়।
অমৃতের ভাগ দিব হবে মৃত্যুঞ্জয়।।
এত বলি দেবরাজ চলিল ত্বরায়।
দৈত্যগণ নিকটেতে হইল উদয়।।
অসুর গণেরে ইন্দ্র কহিতে লাগিল।
সমুদ্র মন্থন কথা সকল জানাল।।
শুনিয়া সুধার কথা দৈত্যগণ কয়।
শুন শুন দেব গণ নাহি কোন ভয়।।
তোমাদের সঙ্গে মোরা মথিব সাগর।
অমৃত খাইয়া শেষে হইব অমর।।
এত বলি দৈত্যগণ স্বীকার করিল।
দেবাসূরে এক সঙ্গে পর্ব্বত আনিল।।
পর্ব্বত আনিয়া জলে নিক্ষেপ করিল।
ভীষণ পর্ব্বত খানি জলে ডুবে গেল।।
ডুবিল পর্ব্বত যদি না দেখি উপায়।
দেবাসূরে ডাকে প্রভু কোথা দয়াময়।।
দেবতা কাতর দেখি এল নারায়ন।
ভয় নাই আসিয়াছি কহিল তখন।।
কূর্ম্মরূপে নারায়ন সমুদ্রে পসিল।
দুর্জ্জয় পর্ব্বত খানি পৃষ্ঠেতে ধরিল।।
বাসুকিরে রজ্জু করি পর্ব্বত বেড়িল।
দুই পার্শ্বে দেবাসুরে টানিতে লাগিল।।
পুচ্ছদেশ দেবতারা করিল ধারণ।
মস্তক ধারণ করে যত দৈত্যগণ।।
মন্থন করিছে তারা সবে মহাবল।
মহাশব্দে উথলিল সমুদ্রের জল।।
এইভাবে দেবাসুর করিছে মন্থন।
বাসুকির মুখে হল বিষ উদগীরণ।।
বিষের তাপেতে সবে দুর্ব্বল হইল।
কাতর দেখিয়া প্রভু শক্তি সঞ্চারিল।।
শক্তি পেয়ে দেবাসূরে টানিতে লাগিল।
অকস্মাৎ লক্ষ্মীদেবী ভাসিয়া উঠিল।।
উচ্চৈঃশ্রবা অশ্ব উঠে ওঠে ঐরাবত।
আর যত মহাবস্তু উঠিয়াছে কত।।
সে সব লিখিতে গেলে পুঁথি বেড়ে যায়।
সংক্ষেপে কহিনু আমি তত্ত্ব সমুদয়।।
বারুণী উঠিল পরে নারী মূর্ত্তি ধরি।
অপূর্ব্ব মূরতি খানি মধুর মাধুরী।।
বারুণীকে দেখে সবে চমকিত হল।
অসুরেরা সবে মিলে বলে ধরি নিল।।
বারুণী বলিল আমি অসুরে না চাই।
দেবতা ভজিব আমি অন্য গতি নাই।।
অসুর ত্যাজিয়া এল দেবগণ ঠাঁই।
দেবগণ বলে মোরা তোমাকে না চাই।।
দৈত্যগণ বলে ধরি নিয়েছে তোমায়।
কলঙ্কিত হও তুমি যাও অন্যথায়।।
এত যদি বলিলেন যত দেবগণ।
কান্দিতে লাগিল দেবী ঝরে দু’নয়ন।।
কান্না দেখি আসিলেন প্রভু নারায়ন।
কহিতে লাগিল প্রভু মধুর বচন।।
জলেতে জন্মিলে তুমি জলে মিশে যাও।
তীর্থরূপে ধরাধামে অবতীর্ণ হও।।
বারুণী কহিল আমি ধরাধামে যাব।
পাপীর পাপের ভার কেমনে সহিব।।
সত্য,ত্রেতা,দ্বাপরেতে নাহি কোন ভয়।
সত্য নিষ্ঠ শুদ্ধাচারী স্পর্শিবে আমায়।।
কলির পাপের ভার সহিব কেমনে।
কহ কহ কহ প্রভু ধরি শ্রীচরণে।।
বারুণীর কথা শুনি বলে দয়াময়।
তোমার লাগিয়া আমি জন্মিব ধরায়।।
মধুকৃষ্ণা ত্রয়োদশী যেই দিন হবে।
ভক্তগণে স্নান করি বাঞ্ছা - পুরাইবে।।
কতবার কতরূপে হব অবতার।
ভক্তগণ লাগি যাব ধরণী মাঝার।।
মধুকৃষ্ণা ত্রয়োদশী শুভ-লগ্ন পেয়ে।
তোমাকে বাসিব ভাল জনম লভিয়ে।।
বারুণী কহিল আমি জানিব কেমনে।
কহ কহ কহ প্রভু ধরিগো চরণে।।
প্রভু বলে ওগো দেবী শুন দিয়া মন।
যেই ক্ষণে জন্ম লব সুতিকা ভবন।।
আমি হরি আমি হরি কব তিনবার।
সে দিন জানিবে তুমি থাকিয়া অন্তর।।
সেই হতে বারুণীর সঙ্গে কথা ছিল।
সে কারণে ওড়াকান্দি অবতীর্ণ হল।।
বারুণীর জন্ম কথা শুনে যেই জন।
অন্তিম কালেতে পাবে হরি দরশন।।
তাই বলি ওরে মন হরি হরি বল।
হরিনামে তরী করে ভব পারে চল।।
কান্দিয়া বিনোদ বলে বেলা ডুবে গেল।
প্রেমানন্দে বাহু তুলে হরি হরি বল।।