তৃতীয় সংস্করণের ভূমিকা
জাগ্রত চেতনা: দেখি, শুনি, পড়ি, জানি – মননে-বচনে-কর্মে সমাজ জাগরণ
তৃতীয় সংস্করণের ভূমিকা
“মহানন্দ হালদার বিরচিত “শ্রীশ্রীগুরুচাঁদ চরিত” গ্রন্থের ভূমিকা লেখার জন্য আমাকে বলা হয়েছে। এই বিশাল গ্রন্থের ভূমিকা এত স্বল্প পরিসরে লেখা সম্ভব না। উনবিংশ শতকের মধ্যভাগ হতে বিংশ শতকের তিনের দশক পর্যন্ত সময়ের সমাজ, সংস্কৃতি, অর্থনীতি, রাজনীতি এবং ধর্মক্ষেত্রে শ্রীশ্রীগুরুচাঁদ ঠাকুরের বিরাট ভূমিকা এই গ্রন্থে লিপিবদ্ধ রয়েছে। সেদিক দিয়ে এই মহাগ্রন্থের মূল্য অপরিসীম।
পূর্ণব্রহ্ম শ্রীশ্রীহরিচাঁদ ঠাকুরের পাদস্পর্শে বাংলার পতিত তথা নিমজ্জিত মানুষের দল আত্মজাগৃতির জন্য জেগে উঠেছিল। এই ধূলি-ধূসরিত মাটির পৃথিবীতে নেমে এসেছিলেন হীন অস্পৃশ্য অন্ত্যজ শ্রেণীর ভগবান। স্বর্গীয় আনন্দচ্ছটায় ভেসে গেল হীন অস্পৃশ্য পতিত মানুষের ভাঙ্গা কুটীর। এই মহামানবের আবির্ভাবে দেশের বর্ণ কৌলিন্যধারীদের মধ্যে চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছিল। পতিত মানুষের নবজাগৃতি দেখে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সেদিন তাদের উদ্দেশ্যে সতর্কবাণী উচ্চারণ করে ‘অপমানিত’ কবিতায় লিখেছিলেন-
তবু নত করি আঁখি,
দেখিবারে পাও নাকি,
নেমেছে ধূলার তলে হীন পতিতের ভগবান।
পূর্ণব্রহ্ম শ্রীশ্রীহরিচাঁদ ঠাকুরই এই পতিতের ভগবান। তাঁর অসীম করুণায় বাংলার পতিত মানুষের সমাজ আত্মশক্তিতে বলিয়ান হয়ে উঠেছিল। সেদিনের সেই নবজাগরণের ঢেউ ভারতবর্ষের দিকে দিকে অনুরণিত হয়ে ছুটে গিয়েছিল। বহু শতাব্দী পরে আজ ভারতবর্ষের দলিত-পতিত মানুষের আত্মজাগরণ শুরু হয়েছে। এর মূলে পূর্ণব্রহ্ম শ্রীশ্রীহরিচাঁদ ঠাকুরের অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। তিনি পতিত মানুষকে নিজস্ব ধর্ম দিয়ে বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের আক্রোশ, নির্যাতন এবং দলন-পীড়ন থেকে রক্ষা করেছিলেন।
সেই জাগ্রত জনমানসকে আধুনিক যুগ ও জীবনের দ্বারপ্রান্তে পৌছে দেওয়ার জন্য মহাকাল মহেশ্বররূপী শ্রীশ্রী গুরুচাঁদ ঠাকুর এই ধরাধামে এসেছিলেন। পিতা-পুত্রের অভেদাত্মা বা “হরি ও হরের” মিলনে পতিত জাগরণ এবং মুক্তির নবদিগন্তের সূচনা করেছিল। বাংলার এই মহামনীষায় ভারতবর্ষের পতিত বা দলিতরা আজ প্লাবিত। দলিত পতিতদের ধর্ম ও কর্ম জীবনের নবদিগন্ত খুলে দেওয়াই মতুয়াধর্মের সাধনা। এ সাধনা দলিত-পতিতদের আধ্যাত্মিক জগতের পরিপূর্ণতার সাধনা, এ সাধনা কর্ম জগতের বহুধা বিস্তৃত প্রাঙ্গণে আধিপত্য লাভের সাধনা। হাজার বৎসরব্যাপী বৌদ্ধ, ব্রাহ্মণ্য ও ইসলাম ধর্মাবলম্বীরা বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষকে অবদমিত করে দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ করে স্ব স্ব ধর্মে ধর্মান্তরিত করার চক্রান্তে লিপ্ত ছিল। পূর্ণব্রহ্ম শ্রীশ্রীহরিচাঁদ ঠাকুর তাদের নিজস্ব ধর্ম দিয়ে কলিযুগের পূর্ণতা বিধানে নবযুগের সূচনা করেছিলেন। আর মহাকাল মহেশ্বররূপী শ্রীশ্রীগুরুচাঁদ ঠাকুর ধর্ম ও কর্মের মেলবন্ধনে গড়ে তুলেছিলেন পতিত মানুষের জীবন বেদ। আজ সেই মহাবৃক্ষের ফল অনুন্নত মানুষের সমাজে উদ্ভাসিত। এই ঐতিহাসিক সত্য মহানন্দ হালদার রচিত “শ্রীশ্রীগুরুচাঁদ চরিত” গ্রন্থে সুন্দর ভাবে তুলে ধরা হয়েছে। তাই এই মহাগ্রন্থ সমগ্র অনুন্নত ও অনগ্রসর শ্রেণীর মানুষের মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাস, ধর্ম ও কর্মের ইতিহাস।
পূর্ণব্রহ্ম শ্রীশ্রীহরিচাঁদ ঠাকুর প্রবর্তিত মতুয়াধর্মের ধমীয় কাঠামোর ছত্রতলে বাংলার পতিত মানুষেরা জমিদার, নায়েব-গোমস্তা, মহাজন, দরবেশ, ফকিরদের অন্যায়-অত্যাচার ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ শুরু করে। এটাকে বলা হয় শিল্প বিপ্লব, পূর্ব যুগের সামাজিক প্রতিবাদ তারই ফলশ্রুতি হিসাবে বাংলায় নীলবিদ্রোহ, কৃষক প্রতিরোধ আন্দোলন প্রভৃতি অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সেই ধর্মীয় কাঠামোকে দিয়ে মহাকাল মহেশ্বররূপী শ্রীশ্রী গুরুচাঁদ ঠাকুর সর্বপ্রথমে মতুয়াভক্তদের দিয়ে শিক্ষা আন্দোলন শুরু করেছিলেন। নানাপ্রকার বাধাবিপত্তি এবং বিরোধীতা সত্ত্বেও মতুয়াভক্তরা বিভিন্ন স্থানে নিজেদের উদ্যোগে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলে। তিনি জানতেন যে জাগতিক ও অর্থনৈতিক অধিকার অর্জনের প্রথম সোপান শিক্ষা। বর্ণ কৌলিন্যধারীরা শিক্ষাকে কুক্ষিগত করে রেখে পতিতদের অন্ধকারে নিমজ্জিত করে রেখেছে। তাই ১৮৭২ খ্রিষ্টাব্দে শ্রীশ্রীগুরুচাঁদ ঠাকুরের নির্দেশে মতুয়াদের নেতৃত্বে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। সেই জন্য ব্রিটিশ সরকার নবপ্রবর্তিত ইংরাজী শিক্ষা সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হয়। এই কার্যে খ্রিস্টান পাদ্রি ডঃ সি. এস. মীডের সাহায্য তিনি পেয়েছিলেন, তার ফলে এ দেশে শিক্ষা, চাকুরী ও আইন সভায় আসন সংরক্ষণ হয়। এ ব্যাপারে তিনি বাংলার গভর্নর স্যার ল্যান্সলট হেয়ারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তিনি শিক্ষা ও চাকুরীর সঙ্গে সঙ্গে অনুন্নত শ্রেণীর মানুষের রাজনীতির ক্ষেত্রও প্রস্তুত করেছিলেন এবং নিজের পৌত্র শ্রীশ্রীপ্রমথরঞ্জন ঠাকুরকে রাজনীতির অঙ্গণে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন, রাজনীতি ক্ষেত্রে শ্রীশ্রীগুরুচাঁদ ঠাকুর দক্ষিণপন্থী বা বামপন্থীর কোন পন্থীই ছিলেন না। দেশ বিভাগের পূর্বপর্যন্ত মতুয়া ভক্তেরা সেই নীতিই অনুসরণ করে চলত। তিনি নমঃশূদ্রদের চণ্ডাল গালি মোচন করেছিলেন।
খ্রিষ্টান মিশনারী ডঃ সি. এস., মীড শ্রীশ্রীগুরুচাঁদ ঠাকুর সম্পর্কে লিখেছিলেন- “তিনি ছিলেন চিন্তার ঔদার্যে, অমিত তেজস্বীতায় এবং দুরদৃষ্টিতে ক্ষুরধার বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ, যা প্রাচীন পন্থীদের মধ্যে দেখা যায় না।” তৎকালীন ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু তাঁকে মহামানব হিসাবে শ্রদ্ধা নিবেদন করেছিলেন। জাতির জনক মহাত্মা গান্ধী তাঁকে একজন “মহান গুরু” হিসাবে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন এবং নিজে ওড়াকান্দী গিয়ে তাঁর সঙ্গে দেখা করার মনোবাসনা ব্যক্ত করে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশকে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগের নির্দেশ দিয়েছিলেন। বাংলার পতিত তথা অনুন্নত শ্রেণীর মানুষের মঙ্গল কামনায় শ্রীশ্রীগুরুচাঁদ ঠাকুর ছিলেন এক বিভোর গৃহী সন্ন্যাসী। তিনি বাংলার একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্ত পর্যন্ত ছুটে বেড়িয়েছেন অনুন্নত শ্রেণীর মানুষের মুক্তির বার্তা নিয়ে। তাই তাঁর আদর্শ ও বাণী বর্তমান প্রজন্মের পিছিয়ে পড়া মানুষের জীবনদর্শন। মহানন্দ হালদার রচিত “শ্রীশ্রীগুরুচাঁদ চরিত” গ্রন্থের মধ্যে এই সব তত্ব ও তথ্য সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে। আশা করি পাঠক ও গবেষকেরা এই গ্রন্থ পাঠ করে তৃপ্ত হবেন।
১/১/১৯৯৮ বীণাপানি দেবী ঠাকুরাণী
শ্রীধাম ঠাকুরনগর, ঠাকুরবাড়ী,
উঃ ২৪ পরগণা, পঃ বঃ