জাগ্রত চেতনা: দেখি, শুনি, পড়ি, জানি – মননে-বচনে-কর্মে সমাজ জাগরণ
হরিচাঁদ গুরুচাঁদ করিয়া স্মরণ।
তারক চাঁদের গুণ করিব বর্ণন।।
পরশ পরশে যেন লৌহ সোনা হয়।
তারকের পরশেতে পশু বৃত্তি ক্ষয়।।
মানুষ মানুষ হয় তাহার পরশে।
চোর সাধু হয়ে যায় তাহার বাতাসে।।
তার কিছু তত্ত্ব কথা বলিব এখন।
মধুর চরিত্র কথা শুন দিয়া মন।।
সত্যবাদি জিতেন্দ্রিয় পুরুষ রতন।
পরনারী মাতৃভাব সদা তার মন।।
হরিচাঁদ পদ যুগ্ম হৃদয় ধরিয়া।
দেশে দেশে কবিগান বেড়ায় গাহিয়া।।
একদিন কবিগান গাহিবার তরে।
দল বল লয়ে চলে কালিয়া বাজারে।।
তিন দিন কবিগান হইবে তথায়।
নৌকা যোগে কালিয়াতে হইল উদয়।।
দলের দোঁহার ছিল সূর্য্য নারায়ণ।
কাঙ্গালী বেপারী আর ভোলা সনাতন।।
বিপক্ষের সরকার গোবিন্দ নামেতে।
নাম করা কবিয়াল বিখ্যাত জগতে।।
তাহার দলেতে ছিল সে মনমোহিনী।
অতি সুমধুর ছিল তার কন্ঠধ্বনি।।
বেশ্যা বৃত্তি ছিল তার পাপ কর্মে রত।
গান শুনে সবাকার হয় মনমত।।
কন্ঠস্বর ছিল তার অতি মধুময়।
সে কারণে কাবিগানে বিখ্যাত সে হয়।।
গোবিন্দ তাতীর দলে দোঁহারী করিত।
সুকন্ঠ গাইকা বলে দলেতে রাখিত।।
প্রথম দিনেতে কবি হইল তথায়।
তরকের গুণগান সব লোকে কায়।।
তাই শুনে চারিদিকে জনরব হলো।
জ্ঞানীগুণী যত লোক তথায় আসিল।।
ব্রাহ্মণ কায়স্থ আদি পণ্ডিত সমাজ।
হিংসা বৃত্তি নিয়ে তারা আসিলেন আজ।।
গোবিন্দ তাতীর দল গাহে যবে গান।
কোন কিছু না বলিল পণ্ডিতের গণ।।
তারক যখনেতে সেই আসরেতে গেল।
শত শত প্রশ্ন তারা করিতে লাগিল।।
তাই জেনে সে তারক শ্রীহরি স্মরিয়া।
সে কথার যব দিল সুন্দর করিয়া।।
এমন সুন্দর কথা শোনে নাই কেউ।
সুমধুর কথা শুনে ওঠে প্রেম ঢেউ।।
মহাভাব উথলিয়া কাব্য কথা কয়।
তাই দেখে শ্রোতাগণ করে জয় জয়।।
তারকের দেহ হতে জ্যোতি বাহিরায়।
তাই দেখে কত জনে পড়িলেন পায়।।
রামাগণে বাসা স্বরে উলুধ্বনি দেয়।
প্রেমের তরঙ্গে সবে ভাসিয়া বেড়ায়।।
জ্ঞানহারা প্রায় সেই পণ্ডিতের দল।
আধ আধ ভাষা দিয়ে বলে হরি বল।।
কেহ কেহ পড়িলেন তারকের পায়।
মাটিতে পড়িয়া কেহ গড়াগড়ি যায়।।
এই ভাবে প্রেম নিধি হইলেন শান্ত।
তারপর সে তারক গান করে ক্ষান্ত।।
জ্ঞানীগুণী শ্রোতাগণ একত্র হইয়া।
রজত পদক এক গঠিয়া আনিয়া।।
তাহাতে লিখিয়া দিল কবি রসরাজ।
তারকের গলে দিল পণ্ডিত সমাজ।।
জয় জয় ধ্বনি ওঠে আকাশ ভেদিয়া।
রমাগণে উলুধ্বনি দিলেন আসিয়া।।
তাই জেনে গোবিন্দের যতেক দোঁহার।
মনে মনে বিষাদিত তাদের অন্তর।।
গোবিন্দরে ডেকে বলে সে মনমোহিনী।
তারকের জয় গান চারিদিকে শুনি।।
আমাদের কন্ঠ ভাল সব লোকে কয়।
তবে কেন তারকের হয় জয় জয়।।
মোহিনীর কথা শুনে কহিল গোবিন্দ।
তারকের জয় গানে কেন কর সন্ধ।।
ব্রহ্মচারী মহাসাধু তারক গোঁসাই।
তারকের কোন দিন পরাজয় নাই।।
শক্তি যদি কোন দিন নষ্ট হয় যায়।
সেই দিন তারকের হবে পরাজয়।।
তাই শুনে মোহিনী ভাবে মনে মন।
তারকের শক্তি আমি করিব হরণ।।
আজি নিশি যাব আমি তারকের ঠাই।
পরীক্ষা করিব আমি কেমন গোঁসাই।।
গভীর রজনী দেখি মোহিনী চলিল।
যে ঘরেতে সে তারক ঘুমাইয়া ছিল।।
তারকের কোলে করে শুইল মোহিনী।
কাম শক্তি জাগাইতে চেষ্ঠা করে ধনী।।
তারকের দেহে যেই করিল পরশ।
ভাবের উদয় হয়ে হইল অবশ।।
তখন তারক চন্দ্র মা বলে ডাকিল।
এত দিন পরে মাগো মনেতে পড়িল।।
শিশু বেলা কোলে করে ঘামাতে আমায়।
আজ বুঝি মনে পড়ে এসেছ হেথায়।।
তই শুনে সে মোহিনী কান্দিতে লাগিল।
অনুরাগ ভরে শেষে কান্দিয়া কহিল।।
আমি যদি তব মাতা হই ধরা পরে।
আর বার মা বলিয়ে ডাক বাবা মোরে।।
এত যদি কহিলেন সে মনমোহিনী।
মা মা বলিয়া ডাকে কবি চূড়ামণি।।
তাই শুনে সে মোহিনী কান্দিতে লাগিল।
আমার জনম ধন্য মনেতে ভাবিল।।
বাৎসল্যেতে ভরপুর তাহার হৃদয়।
নয়ন জলেতে তার বক্ষ ভেসে যায়।।
কেন্দে কেন্দে চলিলেন গোবিন্দের কাছে।
চরণে পড়িয়া শেষে কান্দিয়া বলেছে।।।
শুন শুন মহাশয় বলি তব ঠাই।
বিদায় কর হে মোরে দেশে চলে যাই।।
শুনিয়া গোবিন্দ বলে মোহিনীর ঠাই।
কেন তুমি চলে যাবে কহ মোরে তাই।।
মোহিনী বলেছে আমি কবি না গাহিব।
গৃহে থেকে আর আমি বাহিরে না যাব।।
এই মাত্র তারকের মা হয়েছি আমি ।
আমি যদি কবি গাই হবে বদনামি।।
জননী হইয়া যদি করি কবিগান।
প্রকারেতে তারকের হবে অপমান।।
তাই বলি মহাশয় চরণে জানাই।
বিদায় কর হে মোরে দেশে চলে যাই।।
তাই শুনে সে গোবিন্দ মনেতে ভাবিল।
শুনিয়া সকল কথা বিদায় করিল।।
বিদায় হইয়া শেষে দেশে চলে গেল।
তারকের পরশেতে হরি ভক্ত হল।
তারপর শুন এক আশ্চর্য্য ঘটনা।
হরিভক্ত নিকটেতে করিব বর্ণনা।।
তারকের গৃহে ছিল একটি বৃষভ।
পশু জাতি বলে তার পশুর স্বভাব।।
পশুদের ধর্ম আছে ধর্ম জ্ঞান নাই।
মানুষের সব আছে শ্রেষ্ট হয় তাই।।
বৃষভের নাম রাখে তারক গোঁসাই।
শম্ভু শম্ভু বলে তারে ডাকিত সদাই।।
ডাক দিলে কাছে এসে শ্রীঅঙ্গ চাটিত।
অবলা সেই পশু জাতি ভালবাসা দিত।।
একদিন গাভী আর বৃষভ সঙ্গেতে।
সে নবগঙ্গায় চলে স্নান করাইতে।।
অন্য এক গাভী ধায় ঋতুবতী হয়ে।
তাই দেখে সেই শম্ভু চলিলেন ধেয়ে।।
তাই দেখে শ্রী তারক দ্রুতগতি যায়।
শম্ভুকে কহিছে তিনি হস্ত দিয়ে গায়।।
তারকের পরশেতে কাম দুরে গেল।
তারকের সঙ্গে এসে নদীতে নামিল।।
তারপর স্নান করি গৃহতে চলিল।
পশু পাখী যেন তার অনুগত ছিল।।
এহেন পরশমণি আসিল জগতে।
চোর সাধু হয়ে গেল তার পরশেতে।।
অপুত্রকে পুত্র পায় তাহার কথায়।
নির্ধনের ধন হয় তার করুণায়।।
ভুত প্রেত মুক্তি পায় তার দরশনে।
মহা ব্যাধি মুক্তি হয় তাহার স্মরণে।।
এ দীন বিনোদ বলে পাঁচালীর ছন্দে।
তারকের ছবিখানি হৃদয়েতে বন্দে।।
তাই বলি ভাই সব বেলা বেশী নাই।
হরিচাঁদ প্রীতে সবে হরি বল ভাই।।