গ্রন্থকারের নিবেদন
জাগ্রত চেতনা: দেখি, শুনি, পড়ি, জানি – মননে-বচনে-কর্মে সমাজ জাগরণ
গ্রন্থকারের নিবেদন
মঙ্গলময়ের করুণায় এতদিনে “শ্রীশ্রীগুরুচাঁদ চরিতের” লিপি-কার্য শেষ হইল। এই সুমহান কার্যের ভার আমার মত অভাতজন অপেক্ষা অন্য কোন লিপিকলাকুশল দার্শনিক ভক্তকবির উপরে ন্যস্ত হইলেই অধিকতর শোভন ও সুসঙ্গত হইত; পরন্তু মানব সমাজ তাহা হইলে অধিকতর উপকৃত হইতে পারিত। কিন্তু ইচ্ছাময়ের কোন ইচ্ছাবলে জানি না-মতুয়া মহাসংঘাধিপতি তথা মতুয়া প্রধানবর্গ এই সুমহান কার্যের ভার এই অভাজনের উপরেই ন্যস্ত করিলেন। যে দাবী ও আশা লইয়া তাঁহারা এই মহান কার্য আমার উপর ন্যস্ত করিয়াছিলেন তাহার কিছুমাত্র যে আমার দ্বারা পুরণ হইয়াছে তাহা আমি বিশ্বাস করিতে পারিতেছি না- যদি কিছু হইয়া থাকে তবে তাহা সম্পূর্ণই তাঁহাদিগের আশীর্বাদ, শুভেচ্ছা ও প্রেরণা সর্বোপরি শ্রীশ্রীহরি-গুরুচাঁদের অসীম করুণাবলেই হইয়াছে। তাঁহার কাজ তিনিই করিয়াছেন এবং করাইয়াছেন।
গ্রন্থে লিখিত বিষয়-বস্তুর আলোচনা করিবার পূর্বে সর্বসাধারণ পাঠকবর্গের অবগতির জন্য আমি শ্রীশ্রীগুরুচাঁদ ঠাকুরের এবং যে পবিত্র বংশে তিনি আবির্ভূত হইয়াছিলেন তাহার সংক্ষিপ্ত পরিচয় দিতেছি।
শ্রীশ্রীগুরুচাঁদ ও তাঁহার বংশ পরিচয়
শ্রীশ্রীগুরুচাঁদ ঠাকুরের মহানপিতা যুগাবতার মহামানব শ্রীশ্রীহরিচাঁদ ঠাকুরের অপূর্ব লীলা-কাহিনী “শ্রীশ্রীহরিলীলামৃত” গ্রন্থ প্রণেতা মহাত্মা কবিরসরাজ তারকচন্দ্র সরকার মহোদয় তদীয় গ্রন্থে এই পবিত্র বংশের বিস্তৃত ইতিহাস লিপিবদ্ধ করিয়াছেন। তাহা হইতে জানা যায় যে খ্রিষ্টীয় ষোড়শ শতাব্দীতে মিথিলা প্রদেশবাসী জনৈক অলৌকিক শক্তিধারী মহাপুরুষ এই বংশের আদি পুরুষ। ইহার না রামদাস ব্রহ্মচারী। ইনি জাতিতে ব্রাহ্মণ ছিলেন। ব্রহ্মচারী হইলেও তিনি অকৃতদার নহেন এবং তাঁহার সুযোগ্যা পত্নী রুক্মিণী দেবীও অলৌকিক শক্তির অধিকারিণী হইয়াছিলেন। রামদাস শক্তিসাধক ছিলেন এবং তাঁহার সঙ্গে সব সময়ে একটি সিন্দুরলিপ্ত ত্রিশুল থাকিত। রামদাসের আবির্ভাবের পূর্বেই মহাপুরুষ শ্রীশ্রীচৈতন্যদেব সমস্ত ভারতবর্ষে এক অপূর্ব ভাবের ঢেউ তুলিয়া যান। এই জন্যেই বিভিন্ন প্রদেশ হইতে শ্রীশ্রীচৈতন্যদেবের তিরোধানের পরেও এই ভাব-তরঙ্গের উৎস সন্ধানে বহু নরনারী বঙ্গদেশে নবদ্বীপের পানে ছুটিয়া আসিতে থাকে এবং নবদ্বীপ তৎকালে ভারতের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ সংস্কৃতি-কেন্দ্রে পরিণত হয়। মহামতি রামদাস ও সাধ্বী পত্নীকে সঙ্গে লইয়া বৃন্দাবন প্রয়াগাদি বিভিন্ন তীর্থ পর্যটন করিতে করিতে বঙ্গদেশে নবদ্বীপ ধামে উপস্থিত হইলেন। শক্তির উপাসক হইলেও রামদাস বৈষ্ণবগণের সঙ্গে মিশিয়া কৃষ্ণকথা আলাপন করিতে ভালবাসিতেন এবং উত্তরকালে এই কৃষ্ণ প্রেমই তাহার জীবনকে অধিকতর প্রভাবান্বিত করিয়াছিল। তিনি পরে সস্ত্রীক চন্দ্রনাথ তীর্থ দর্শন করিতে গিয়া পুণ্যসলিলা নবগঙ্গা নদীর নাম শ্রবণ করেন এবং উহা দর্শন করিতে যশোহর জিলার লক্ষ্মীপাশা গ্রামে উপস্থিত হন। লক্ষ্মীপাশা সে সময়েও এক ধনধান্যশালিনী বর্ধিষ্ণু হিন্দুপল্লী ছিল। বাঙ্গালী হিন্দুর জাতীয় জীবনের ইতিহাস এ সময়ে ঘোর তমসাচ্ছন্ন ছিল সন্দেহ নাই। বৌদ্ধ রাজা পালবংশধরগণ বঙ্গের সিংহাসনে নাই; ব্রাহ্মণ্য ধর্মের পরিপোষক সেন রাজগণেরও পতন হইয়াছে বটে কিন্তু বল্লাল সেনের প্রবর্তিত কৌলিন্য প্রথা বাঁচিয়া রহিয়াছে। কৌলিন্য প্রথার ফলে ধীরে ধীরে সমাজের মধ্যে বহু শাখা প্রশাখার সৃষ্টি হইতেছে; “আমি কুলীন” “আমি বংশজ” এই প্রকারের আত্মভরিতাপূর্ণ কলহের ফলে দুর্দান্ত শনিগ্রহের মত অস্পৃশ্যতা মহাপাপ সমাজের মধ্যে বিস্তার লাভ করিয়াছে।
হিন্দুর জাতীয় জীবনে এই সময় ভেদ বিভেদের ফলে যে কি পরিমাণ অধোগতি আসিয়া উপস্থিত হইয়াছিল তাহা সেই সময়কার একটি পল্লী-ছড়া হইতেই বুঝিতে পারা যায়। এই ছড়ার মধ্যে মাত্র ব্রাহ্মণ সমাজের পরিচয় আছে। আমি উহা এখানে উল্লেখ করিতেছি-
ষড়গোত্র ছাপ্পান্ন গাঁই,
এর বেশী আর বামুন নাই,
যদি থাকে দু’এক ঘর,
সারস্বত আর পরাশর,
আর যত সব “বিয়ালদার”।
‘বিয়ালদার’ বলিতে যে কাহাদিগকে বুঝাইত তাহার কোনও ঐতিহাসিক প্রমাণ পাওয়া যায় না; তবে তাহারাও যে ব্রাহ্মণ ছিলেন একথা নিঃসন্দেহে বলা যাইতে পারে। এই ভাবে শুধু ব্রাহ্মণ নয় বাঙালী হিন্দুর বিভিন্ন শাখার মধ্যেও গুরুতর ভেদবাদের ফলে এক দারুণ সংকটময় পরিস্থিতির উদ্ভব হইতেছিল। এ সময়ে লক্ষ্মীপাশা গ্রামে অধিকাংশ ব্রাহ্মণের বাস ছিল। আর একটি জাতি লক্ষ্মীপাশা ও তাহার নিকটবর্তী গ্রামসমূহে বিপুল সংখ্যায় বাস করিতেছিল। ইহারাই বীর নমঃশূদ্র জাতি। এই জাতিটির কোনও বিশেষ লিপিবদ্ধ ইতিহাস আজিও উদ্ধার হয় নাই বটে তবে সমসাময়িক ঐতিহাসিক ঘটনা, সামাজিক আচার ব্যবহার, রীতিনীতি আলোচনা করিয়া ইহা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে এই জাতি কোন অন্ত্যজ বা হীন জাতি নহে এবং ইহাদের পূর্বপুরুষগণ সকলেই ব্রাহ্মণ ছিলেন এবং ইহাদিগের ধমনীতে একমাত্র ব্রাহ্মণের রক্তই প্রবাহিত হইতেছে। এই জাতির সম্বন্ধে কিছু কাল পূর্ব হইতেই বাংলার বর্ণ হিন্দুগণ একটু সচেতন হইয়াছেন বলিয়া মনে হয় এবং এই জাতিটির পরিচয় সম্বন্ধে নানা জনে নানা কথা বলিতে আরম্ভ করিয়াছেন। শারীরিক শক্তি ও যুদ্ধ বিদ্যায় বাংলার অন্যান্য সম্প্রদায় হইতে নমঃশূদ্রগণ শ্রেষ্ঠ বলিয়া পরলোকগত স্বামী বিবেকানন্দ ইহাদিগকে ক্ষত্রিয় বলিয়া মনে করিয়াছিলেন ও প্রকাশ্য সভায় ও তাহা প্রকাশ করিয়াছিলেন। সেই কথার উপর নির্ভর করিয়া এবং নমঃশূদ্র জাতির অপূর্ব বীরত্ব দেখিয়া অনেকেই ইহাকে ক্ষত্রিয়ত্বে প্রতিষ্ঠিত করিতে বিশেষ উদগ্রীব হইয়া পড়িয়াছেন। শুনা যায় বাংলার কোন বর্ণ হিন্দু ব্রাহ্মণ যিনি বহু বর্ণহিন্দুগণ কর্তৃক পূজিত হইতেছেন বলিয়া প্রকাশ তিনি এই জাতির মধ্য হইতে বহু লোককে নিজের দলে ভিড়াইবার উৎসাহে এই জাতিটিকে পরাশর ব্রাহ্মণ বলিয়া স্বীকার করিয়াছেন। নাম উল্লেখ না করিয়াও আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার ফলে বলিতেছি যে বাংলার কোন কোন বর্ণ হিন্দু চালিত স্কুলে ইতিহাসের পাঠ শিক্ষাইবার সময় হিন্দু জাতির চতুবর্ণের শেষ বর্ণ ‘শূদ্র’ বলিতে নমঃশূদ্রকেই উল্লেখ করিয়া থাকেন। এই সমস্ত তত্ব অত্যন্ত আধুনিক গবেষণা মাত্র এবং সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। আমি যে সময়ের কথা উল্লেখ করিয়াছিলাম তখন কৌলিন্য প্রথাজাত ভেদনীতির ফলে নমঃশূদ্রগণকে ব্রাহ্মণ বলিয়া স্বীকার করা হইত না। মহাত্মা রামদাস ব্রহ্মচারী অত্যন্ত উদার স্বভাব সম্পন্ন মহাপুরুষ ছিলেন এবং তিনি কখনই জাতিভেদের ক্ষুদ্র গণ্ডী মানিয়া চলিতেন না। সাধারণতঃ কোন স্থানে নিজের ত্রিশূল গাঁড়িয়া তিনি বৈঠক মিলাইতেন এবং কৃষ্ণকথা আলোচনা করিতেন। নমঃশূদ্রজাতি চিরদিনই ধর্মভীরু। ধর্মতত্ব আলোচনা ও ধর্ম সঙ্গীত রচনা এই জাতির একটি চিরন্তন বৈশিষ্ট্য। বঙ্গদেশে যে সময় হইতে কবিগানের ইতিহাস পাওয়া যায় সেই সময় হইতেই বর্তমানকাল পর্যন্ত এই সমাজের মধ্যে অধিকাংশ কবিগান-কর্তা বা ‘সরকার’ জন্মগ্রহণ করিয়াছেন। পরলোকগত দীনেশচন্দ্র সেন মহাশয় তাঁহার সম্পাদিত “ময়মনসিংহ গীতিকার” মধ্যে সুলা-নামিনী একটি নমঃশূদ্র নারী কবির কথাও উল্লেখ করিয়াছেন। মহাকবি কীর্তিবাস ওঝার রচিত রামায়ণের মধ্য হইতে বিষয়বস্তু লইয়া বহু নমঃশূদ্র কবি পালাগান রচনা করিয়া আজিও দেশে দেশে কীর্তন করিয়া বেড়ান। মহাত্মা কবি রসরাজ তারকচন্দ্র সরকার মহোদয় এবং তাঁহার পিতা কাশীনাথ সরকার ও কবি রসরাজ মহোদয়ের সমসাময়িক আনন্দ চন্দ্র সরকার মহোদয় বঙ্গদেশের শ্রেষ্ঠ কবিগানকারগণের মধ্যে অন্যতম ছিলেন। আজিও শিক্ষাদীক্ষার আলোক হইতে বঞ্চিত যে কোন নমঃশূদ্রপল্লীতে ভ্রমণ করিলে সে সমস্ত স্বভাবকবিগণের ধর্মভাবপূর্ণ সঙ্গীতরাজি শুনিয়া যে কোন উচ্চ শিক্ষিত বাঙ্গালীর হৃদয় আনন্দে ভরপুর হইতে পারে। মানব-জীবন-সন্ধ্যার দিকে মৃত্যুর কাল-ছায়া ঘনাইয়া আসিতেছে দেখিয়া নমঃশূদ্র পল্লীকবি সরল সহজ ভাষায় সারা প্রাণের মিনতি জানাইয়া যে কথা তাহার ‘দয়ালের’ কাছে জানাইয়াছে তাহা শুনিলে সত্য সত্যই সংসারের জগদ্দল পাহাড়ের নীচে অচেতন মানবমনে একটি জোর-নাড়া দিয়ে যায়।
“দিন গেল দিন গেলরে দয়াল দিন ত গেলরে ব’য়ে।
এ অধমে কর দয়ারে দয়াল তোমার পদ ছায়া দিয়ে।।
পার কর পার কর রে দয়াল তুমি রসিক নেয়ে।
এ অধম রইল কূলে পড়ে রে দয়াল যেও না তরি বেয়ে।।”
মানব মনের “শেষের আশ্রয়” সেই ‘দয়ালের’ কাছে ইহার চেয়ে প্রাণ-কাঁদান মিনতি আর কি হইতে পারে? এই ভাব প্রবণতা ও ধার্মিকতা গুণে হৃদয় পরিপূর্ণ থাকায় রামদাস ব্রহ্মচারীর বৈঠকে অসংখ্য নমঃশূদ্র আসিয়া জুটিতে লাগিল। রামদাসও স্বীয় উদারতা গুণে প্রাণ খুলিয়া তাহাদের সহিত কথা কহিতেন, তাহাদের সুখ-দুঃখের কথা শুনিয়া ব্যথিত হইতেন এবং সান্তনা দিতেন। এই ভাবে সেই দেব-দম্পতি নমঃশূদ্রগণের “আপনার জন” হইয়া গেলেন। নমঃশূদ্রগণ তাহাদিগকে ভালবাসিয়া, ভক্তি করিয়া তাহাদিগের জন্য একখানি সুন্দর বাসগৃহ নির্মাণ করিয়া দিল। ভক্তের তৈয়ারী কুঁড়ে ঘরের মধ্যে দেব-দম্পতি আনন্দে বসবাস করিতে লাগিলেন। সরল হৃদয় পরমর্ষি ব্রহ্মচারীর এই আচরণে অন্য ব্রাহ্মণগণ বড়ই ক্ষুব্ধ হইলেন। রামদাস জানিতেন যে তাঁহার ভক্তগণ নিজদিগকে ব্রাহ্মণ বলিয়া পরিচয় দিলেও অন্যান্য ব্রাহ্মণগণ তাহাদিগকে ব্রাহ্মণোচিত সমস্ত অধিকার হইতে বঞ্চিত করিয়া রাখিয়াছিল। রামদাস নমঃশূদ্রগণের নিকট ইহার কারণ জিজ্ঞাসা করিলে তাহারা প্রকাশ করিল যে নমংশূদ্র জাতি প্রকৃত প্রস্তাবেই ব্রাহ্মণ সন্তান; শুধু তাহাই নহে তাহারা কৌশলী যোদ্ধাও বটে। বাংলার গৌরব মহারাজা প্রতাপাদিত্য এই নমংশূদ্র সমাজ হইতে বায়ান্ন হাজার ঢালি অর্থ সৈন্য সংগ্রহ করিয়া প্রবল-প্রতাপ মোগল সৈন্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করিয়া জয়ী হইয়াছিলেন। তখন তাহাদিগের বিশেষ সম্মানও ছিল, আদরও ছিল। প্রতাপাদিত্যের পতনের পরে বাংলা দেশের রাজনৈতিক বা সামাজিক জীবনে এক মহাবিপর্যয়ের সূচনা দেখা গেল। রাজশক্তির অভাবে ক্ষাত্র শক্তি ক্রমে ক্রমে লোপ হইয়া আসিল সুতরাং জীবন ধারণের জন্য সেই সমস্ত অমিত-তেজ সৈন্যগণ কৃষি বা অন্যান্য ব্যবসায় অবলম্বন করিতে বাধ্য হইল। ইহাদিগের আচার ব্যবহার ও শ্রাদ্ধের প্রণালী সমস্তই ব্রাহ্মণের মত পরন্ত হিন্দুর পুণ্যতীর্থ গয়া ক্ষেত্রে একমাত্র ব্রাহ্মণও নমঃশূদ্র ব্যতীত অন্য কেহ অন্ন পিণ্ড দিতে অধিকারী নহে। একমাত্র প্রশ্ন হইতে পারে- ব্রাহ্মণ হইয়াও নমঃশূদ্রগণ যজ্ঞ উপবীত ধারণ করে না কেন? ইহার কারণ স্বরূপ বলা যায় যে বঙ্গদেশে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী পাল রাজাদের শাসন সময়ে বঙ্গদেশ একপ্রকার বৌদ্ধ ধর্মের আশ্রয়ে আসিয়া পড়িয়াছিল। ধর্মপ্রাণ নমঃশূদ্র জাতি প্রাণের উদারতার কারণে উদার বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করিয়া বৌদ্ধ হইয়া গেল। সেনরাজগণ ব্রাহ্মণ্যধর্মের প্রতিপোষক ছিলেন। বাংলার রাজদণ্ড হাতে পাইয়া তাহারা ব্রাহ্মণ্য ধর্মের ভিত্তিতে হিন্দুধর্মকে পুনরায় জাগরুক করিবার অভিপ্রায়ে বাংলার বুক হইতে নানাভাবে নানা অত্যাচারে বৌদ্ধ ধর্মকে দূর করিয়া দেন। যাহারা প্রাণ অপেক্ষা ধর্মকে বড় বলিয়া মনে করে সেই বৌদ্ধ ব্রাহ্মণ নমঃশূদ্র জাতি রাজার অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করিল। ফলে মদ-মত্ত বল্লাল সেন সেই সমস্ত বৌদ্ধ ব্রাহ্মণকে নিজ রাজধানী হইতেও দূরে তাড়াইয়া দেন এবং সামাজিক অধিকার হইতে তাহাদিগকে বঞ্চিত করেন। বৌদ্ধ ধর্মে জাতি ভেদ প্রথা নাই- সুতরাং বৌদ্ধ ধর্ম অবলম্বন করিয়া এই সমস্ত ব্রাহ্মণগণ সাম্প্রদায়িক ভেদের প্রতীক উপবীত ত্যাগ করিয়া “ধর্মক্ষেত্রে সকলে সমান” এই মহান বৌদ্ধ নীতি অনুসরণ করেন।
রামদাস নমঃশূদ্রগণের কথা শুনিয়া প্রাণে দারুণ বেদনা পান এবং সঙ্কল্প করেন যে প্রাণপণ চেষ্টার দ্বারা নমঃশূদ্রগণকে সামাজিক অধিকারে উন্নত করিবেন এবং তাহাদিগকে ব্রাহ্মণত্বে পুনঃ প্রতিষ্ঠিত করিবেন। সুতরাং তিনি তাহাদিগের সহিত অধিকতর ভাবে মেলামিশা করিতে থাকেন। ইহাতে বঙ্গবাসী ব্রাহ্মণেরা অত্যন্ত ক্ষুদ্ধ হইলেন। তাহারা রামদাসকে ডাকিয়া বলিলেন “হে ব্রাহ্মাণ। নমঃশূদ্র জাতি অতি হীন, তুমি কি জন্য তাহাদিগের সহিত মেলামিশা কর?” রামদাস তাহাদিগের কথায় প্রতিবাদ করিয়া নানা সুযুক্তি দ্বারা প্রমাণ করিয়া দেখাইলেন যে নমঃশূদ্র জাতি ব্রাহ্মাণই বটে সুতরাং তাহারা হীন নহে। ইহাতে বঙ্গবাসী ব্রাহ্মণগণ অত্যন্ত উত্তেজিত হইয়া রামদাসকে সামাজিক অধিকারে বঞ্চিত করেন এমন কি রামদাস স্বীয় পুত্র চন্দ্রমোহনের বিবাহের জন্য ব্রাহ্মণ সমাজ হইতে কোন কন্যা সংগ্রহ করিতে পারিলেন না। তেজস্বী সাধক অতঃপর নমঃশূদ্রকে প্রকৃত ব্রাহ্মণ মান্য করিয়া এক গুণবতী নমঃশূদ্র কন্যার সহিত স্বীয় পুত্রের বিবাহ দিলেন। বীরসাধকের সাধনায় ভগবানের আসন টলিল; নন্দদুলাল শ্রীকৃষ্ণ স্বপ্নযোগে তাঁহাকে জানাইলেন যে তিনি তাঁহারই বংশে এক মহাভাবময় অবতাররূপে অবতরণ করিবেন। মহাসাধক রামদাস মৃত্যুর পূর্বে স্বীয় পুত্র চন্দ্রমোহনকে সেই কথা বলিয়া যান এবং বংশে যাহাতে সর্বতোভাবে পবিত্রতা রক্ষা হয় সেই দিকে দৃষ্টি রাখিতে বলেন।
রামদাসের পরে এই বংশে আরও পাঁচ পুরুষ গত হইয়া গেল বংশের আদি পুরুষের ইচ্ছা ও আদেশ অনুসারে বংশে সর্বতোভাবে পবিত্রতা রক্ষা করা হইল। এই পাঁচ পুরুষ ধরিয়া কঠোর সাধনা চলিবার ফলে বারশ’ আঠার সালে যুগাবতার শ্রীশ্রীহরি ঠাকুর এই বংশে অবতীর্ণ হইলেন। শ্রীশ্রীহরি ঠাকুরের আবির্ভাবের মূলভিত্তি অনুসন্ধান করিলে আমরা বুঝিতে পারি যে তাঁহার আবির্ভাবের পূর্বেই পৃথিবীতে এক মহাদুর্দিন উপস্থিত হইয়াছিল। কি ধর্মজীবনে, কি রাজনৈতিক জীবনে পৃথিবীর সর্বত্রই এক মহাকলঙ্কপূর্ণ নারকীয় লীলাখেলা চলিতেছিল। মানবজাতির যে পর্যন্তের ইতিহাস পাওয়া যায় তাহাতে সাক্ষ্য দেয় যে যখনই পৃথিবীতে অধর্মের কালভেরী বাজিয়া উঠে, ধর্ম প্রাণহীন হইয়া পড়ে- বিসমতায় পৃথিবীর ভার-কেন্দ্র হেলিয়া পড়ে- তখন বিসমতাকে স্থির করিয়া পৃথিবীর ভারকেন্দ্রকে সমকেন্দ্রে স্থিত করিয়া দিবার উদ্দেশ্যে নানা দেশে নানা মহাপুরুষের আবিভার্ব হইয়া থাকে। সেই মর্মেই এই বঙ্গদেশে যুগাবতার শ্রীশ্রীহরিঠাকুরের আবির্ভাব হইয়াইল। লৌকিক জীবনে শ্রীশ্রীহরিঠাকুর লীলা মাধুর্যের মধ্য দিয়া বাংলার অনুন্নত সম্প্রদায়ের মধ্যে এক অভিনব ভাবের তরঙ্গ তুলিয়া যান। তিনি দেখিলেন যে এই সমস্ত সম্প্রদায়ের ভিতর ধর্মের নামে ঘোর তামসিকতা চলিতেছে। এই তামসিকতাকে দূর করিয়া তাহাদিগকে জ্ঞানে, ধর্মে ও কর্মে উদ্বুদ্ধ করিয়া মানবের চির-আকাঙ্ক্ষিত শান্তির পথে লইবার জন্য তিনি বদ্ধপরিকর হইলেন। তিনি আরও দেখিলেন যে সাধারণ মানব গার্হস্থ্য জীবনকে অবলম্বন করিয়া পৃথিবীতে বাস করিতেছে। সুতরাং একমাত্র গার্হস্থ্য জীবনকে উন্নত করিতে পারিলে বিশ্বমানবের শান্তির পথ উন্মুক্ত করা যায়। তাই তিনি প্রধানতঃ গার্হস্থ্য জীবনের ভিত্তিকে পবিত্রময় করিবার জন্য সমস্ত নরনারীকে উপদেশ দিতে আরম্ভ করিলেন। সঙ্গে সঙ্গে মানব জীবনের একমাত্র পরমাশ্রয় ‘পরমপুরুষের’ উপর সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণের নীতি ও তাঁহার ভক্তগণের মধ্য দিয়া দেখাইলেন। এই সমস্ত সমাজ জীবনে তামসিকতা এরূপভাবে দৃঢ় বদ্ধমূল হইয়াছিল যে তাঁহার লীলাকালের অধিকাংশ সময় সেই সমস্ত সর্বনাশা মূলের সন্ধানে ও উৎপাটনে কাটিয়া গিয়াছিল। বলিতে গেলে তাঁহার লৌকিকজীবন অধর্মের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করিয়াই শেষ হইয়াহিল। তাই তিনি নরলীলা সাঙ্গ করিবার পূর্বক্ষণে যোগ্যতম উত্তর সাধক স্বীয় পুত্র মহামানব শ্রীশ্রীগুরুচাঁদ ঠাকুরকে স্বীয় অভীপ্সিত আদর্শ জগতে প্রতিষ্ঠিত করিবার জন্য আদেশ করিয়া যান। মহামানব শ্রীশ্রীগুরুচাঁদ ঠাকুর পিতৃদেবের আদেশ শিরোধার্য করিয়া আজীবন স্বীয় পিতার মহান আদর্শ প্রতিষ্ঠিত করিবার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করিয়া গিয়াছেন। শ্রীশ্রীহরি ঠাকুর বলিয়াছিলেন শিক্ষা ব্যতীত এই সমস্ত অনুন্নত সম্প্রদায়ের জাগিবার আর আশা নাই। তাই শ্রীশ্রীগুরুচাঁদ ঠাকুর অনুন্নত সম্প্রদায়সমূহের শিক্ষাকল্পে ভক্তগণের সাহায্যে বহু জিলার বহু পল্লীতে বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়িয়া তুলেন। এই মর্মে তিনি স্বীয় জন্মভূমি ওড়াকান্দী গ্রামে ইংরাজ মিশনারীগণের সাহায্যে একটি উচ্চ ইংরাজী বিদ্যালয় স্থাপন করিয়া গিয়াছেন। সেই আদর্শের অনুপাতে আজ বঙ্গদেশের বিভিন্নস্থানে অনুন্নত সম্প্রদায়সমূহ বহু হাইস্কুল স্থাপন করিয়াছেন। এই শুভকার্যের প্রেরণা তাহারা শ্রীশ্রীগুরুচাঁদের নিকট হইতেই পাইয়াছেন।
শ্রীশ্রীগুরুচাঁদ ঠাকুর উপলব্ধি করিয়াছিলেন যে এই সমস্ত সম্প্রদায়সমূহ অর্থাভাবে কতই নিঃম্ব। অর্থনৈতিক জীবনে ইহারা উন্নতিলাভ করিতে না পারিলে ইহাদের রক্ষার আর উপায় নাই। তাই তিনি নিজে আদর্শরূপে সৎভাবে অর্থ উপার্জন করিয়া দেখাইয়াছিলেন যে সৎভাবে পরিশ্রম করিলে লক্ষ্মীর কৃপালাভে কেহই বঞ্চিত হয় না। তাঁহারই আদর্শে অনুপ্রাণিত হইয়া মল্লকান্দি প্রভৃতি স্থানের অনুন্নতগণ ব্যবসায়ের দ্বারা আজ মহা ধনাঢ্য হইয়াছেন।
তিনি আরও উপলব্ধি করিয়াছিলেন যে রাজশক্তির সাহায্য ব্যতীত এই সমস্ত অশিক্ষিত ধনহীন বিদ্যাহীন অনুন্নত সম্প্রদায়সমূহকে উন্নত করিবার সুযোগ হইবে না। তাই তাঁহারই ইচ্ছায় ও আগ্রহে রাজপুরোহিত ডক্টর মীড ওড়াকান্দী আসিলেন। এই ডক্টর মীডের সাহায্যে ও তাহাকে দিয়া শ্রীশ্রীগুরচাঁদ ঠাকুর যে সমস্ত কার্য করিয়াছেন বা করাইয়াছেন তাহাই আজ বঙ্গীয় তপশীলভুক্ত সম্প্রদায় সমূহের মূল পাথেয় হইয়া দাঁড়াইয়াছে। দেশের শাসন কার্যে যে জাতি বা সম্প্রদায়ের অধিকার নাই সাংসারিক জীবন পথে তাহাদিগের উন্নতির আশা সুদূরপরাহত। তাই তিনি ডক্টর মীডের সাহায্যে নমঃশূদ্র প্রভৃতি অনুন্নত সম্প্রদায়ের উচ্চমনা শিক্ষিত যুবক সকলকে রাজকার্যে নিয়োজিত করিয়া দেন। এই ব্যাপারে তিনি রাজপ্রতিনিধিকে বহু ডেপুটেশন ও অভিনন্দনাদি দিয়া জাতির কল্যাণসাধন করিয়া গিয়াছেন। রাজনীতি ক্ষেত্রে তিনি দক্ষিণ বা বাম কোনপন্থীই ছিলেন না। তিনি বলিতেন শিক্ষা-দীক্ষা-হীনের পক্ষে রাজনীতি বিড়ম্বনা সার। আগে শিক্ষা ও দীক্ষায় উন্নত হইতে হইবে; পরে রাজনৈতিক চেতনা আপনা হইতে বুকে জাগিয়া উঠিবে। তখন কাজ করা যাইবে। অনুন্নতজাতি সমূহের মধ্য হইতে ইতিপূর্বে কেহই উচ্চশিক্ষার জন্য “সাত সমুদ্র তের নদীর পারে” বিলাতে যাইতে সাহস পায় নাই। শ্রীশ্রীগুরুচাঁদ স্বীয় পৌত্রকে বিলাতে পাঠাইয়া অনুন্নত সম্প্রদায়সমূহের বুকে মহাবলের সঞ্চার করেন। কঠোর সাংসারিক ও লৌকিক জীবনের তলে তলে ফল্গুধারার মত তাহার ধর্মনীতির স্রোত অব্যাহত গতিতে দিনের পর দিন দেশ হইতে দেশান্তরে ছুটিয়া চলিয়াছে। তাই আমরা দেখি আজ বাংলার ও আসামের প্রায় পাঁচ লক্ষ নরনারী শ্রীশ্রীহরি ঠাকুরের নির্দিষ্ট ধর্মপথে চলিয়া জীবনে ধন্য হইয়াছে। শ্রীশ্রীহরি ঠাকুর গার্হস্থ্য জীবনের যে আদর্শ-নীতি শ্রীশ্রীগুরুচাঁদকে বলিয়া গিয়াছিলেন তিনি তাহা স্বীয় ভক্তগণের মধ্য দিয়া এমন সুন্দররূপে ফুটাইয়া তুলিয়াছেন যে দিকে দিকে দেখা যায় মতুয়ার জীবন কত সুন্দর, তাহার সংসার কত শান্তির।
শ্রীশ্রীগুরুচাঁদ চরিত্রের শেষভাগে “শ্রীশ্রীগুরুচাঁদতত্বামৃত সার” বলিয়া একটি অধ্যায় লিখিত হইয়াছে উহাতে সংক্ষেপে শ্রীশ্রীগুরুচাঁদের প্রচারিত নীতি সমূহ বর্ণিত হইয়াছে। এই সমস্ত নীতি পাঠ করিলে শ্রীশ্রীগুরুচাঁদের সত্যকার পরিচয়ের একটি আভাস পাওয়া যাইবে। মহামানব শ্রীশ্রীগুরুচাঁদ ধর্ম ও কর্ম, ভক্তি ও প্রেমের ভিত্তির উপরে “সংসার ও ভগবানের অপূর্ব মিলনের” যে আদর্শ জগতের সমক্ষে উদঘাটিত করিয়াছেন তাহা ইতিপূর্বে আর কোন ধর্মগুরুই মানব সমাজের সমক্ষে ধরিতে সমর্থ হন নাই। কারণঃ- সত্যের কোন মানদণ্ড নাই। সত্যই সত্যের মানদণ্ড। সত্য স্বয়ং- স্বাধীন স্বস্থঃ। বর্তমান জগতের শ্রেষ্ঠ মানব মহামনীষী মহাত্মা গান্ধীজী জানেন- “সত্যহি পরমেশ্বরঃ”। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ বলিয়া গিয়াছেন “সত্যের কোন geography নাই” অর্থাৎ সত্য ভৌগোলিক সীমায় আবদ্ধ নহে। মনীষী ইংরেজ কবি কীট্স বলিয়াছেন “Truth Beauty, Buty Truth (সত্যং সুন্দর্ম সুন্দরং সত্যম্)”। স্বভাব কবি ওয়ার্ডস্ওয়ার্থ বলিয়াছেন “A thing of Beauty is a joy for ever (সুন্দরং আনন্দস্বরূপম্)”। ভারতের আর্য ঋষির এক বাণী উচ্চারণ, করিয়া বলিয়াছেন “সত্যং শিবং সুন্দরম্”। ভাষার বিভন্নতার দিকে দৃষ্টি না দিয়ে অন্তর্নিহিত তত্বের প্রতি দৃষ্টি দিলে আমরা দেখিতে পাই যে বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন মনীষী বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গী লইয়া একই সত্যরূপী পরমাত্মাকে বিশ্লেষণ করিতে চাহিয়াছেন। কিন্ত বিশ্লেষণের শেষ ত হয় নাই। অজানাকে জানিবার কৌতুহল মানবের স্বাভাবিক ধর্ম। রাশি রাশি তত্ত্বগ্রন্থ, দর্শন, বিজ্ঞান, সাহিত্য, পুরাণ প্রভৃতির মধ্য দিয়া মানুষ কোন স্মরণাতীত কাল হইতে কাহাকে যেন খুঁজিতেছে আজও অনুসন্ধানের শেষ হয় নাই- আজও ‘আত্মা’ দুর্জ্ঞেয় গুহায় রহিয়াছে। প্রাণক্ষয়ী সাধনায় মানুষ তাঁহাকে নিজের অন্তরের মধ্যে, বহিঃপ্রকৃতির লীলাখেলার বুকে, কত অনুসন্ধান করিয়াছে এবং করিতেছে কিন্তু উত্তর মিলিয়াছে ‘নেতি’ ‘নেতি’। তাই সাধনারও শেষ হয় নাই- পরমাত্মার ভূয়োদর্শনও মানবের ভাগ্যে আজিও ঘটিল না। আত্মার সন্ধান মানুষেই করে, তাই এই বিরাট সৃষ্টির মধ্যেও সে আপনার মনে সৃষ্টি করিয়া চলে দর্শন, বিজ্ঞান, কাব্যাদি। “তাঁহার দর্শন মিলিলে সকল ক্ষুদ্রতার অবসান- সকল অশান্তির নাশ হইবে পরন্তু শাশ্বত শান্তির ক্রোড়ে পড়া বা পুনর্জীবন লাভ করিব” আকাঙ্ক্ষাই মানবকে জীবন পথে আগাইয়া লইয়া চলে। তাই যদি কোথাও সে কোনও আশার বাণী শোনে অমনি সেখানে আসিয়া সে জড় হয়- সারা মন প্রাণ দিয়া আশার বাণীর মধ্যে শান্তির সন্ধান করিতে থাকে। সেই জন্যেই মহাপুরুষের চরণতলে শত শত তাপদগ্ধ জীব আসিয়া লুটাইয়া পড়ে। পরমাত্মার সন্ধান-পথে সেখানে সে যতটুকু পায় সেইটুকুই তার লাভ। “তাঁহার বিরাট সৃষ্টির মধ্যে নিজের সৃষ্টির সবটুকু লইয়া যদি তাঁহাকে জানিতে পারি- দেখিতে পারি- ধরিয়া রাখিতে পারি, অর্থাৎ সীমার সঙ্গে যদি অসীমের অভেদ মিলন ঘটাইতে পারি, তবে তাহা অপেক্ষা উৎকৃষ্টতর আর কি হইতে পারে?” এই ধারণাই মানব-জগতের অধিকাংশকে সংসারে জড়াইয়া রাখিয়াছে- উদাসীন সন্ন্যাসী করিয়া দেয় নাই। কবীন্দ্র রবীন্দ্রনাথের ভাষায় মানব মনের এই কল্পনার ছবি আমরা দেখতে পাই-
“সীমার মাঝে অসীম তুমি,
বাজাও আপন সুর।
আমার মাঝে তোমার লীলা
তাই এত মধুর।”
‘সুর’ শুনিয়াছি, ‘লীলা’ দেখিয়াছি, কিন্তু তাঁহাকে ত দেখা হয় নাই; তাই ব্যর্থতার বেদনা রবীন্দ্রনাথের কণ্ঠে বাজিয়া উঠিয়াছে-
“দাঁড়িয়ে আছ তুমি আমার গানের ওপারে।
(আমার) সুরগুলি পায় চরণ, আমি পাই না তোমারে।।”
তাই মানব চাহিতেছ্লি এমন একটি বাণী- যে বাণী তাহাকে ভরসা দিতে পারে যে সে তার সব-কিছু নিয়াই পরমাত্মার সন্ধানে চলিতে পারে। যুগাবতার শ্রীশ্রীহরিঠাকুরের বাণীর মধ্যে এতকাল পরে সেই বাণীরই পূর্ণ আভাস মিলিয়াছে। সংসারের অসংখ্য গ্রন্থির মধ্যে থাকিয়াও যে পরমানন্দের অধিকারী হওয়া মানব জীবনে সম্ভব তাহাই তদীয় মহিমময় জীবনে এবং তদীয় যোগ্যতম উত্তর সাধক পুত্র শ্রীশ্রীগুরুচাঁদের জীবনে প্রকটিত হয়েছিল। সাধারণ মানব সংসার জীবনে যত প্রকার আধি, ব্যাধি, দুঃখ, যন্ত্রণা ভোগ করিয়া থাকে শ্রীশ্রীগুরুচাঁদের লৌকিক জীবনে সমস্তই উপস্থিত হইয়াছিল। আদর্শ বীরের মত তিনি সমস্তই মানুষ হিসাবে সহ্য করিয়াছিলেন। কোন আঘাতেই টলিয়া যান নাই। রৌদ্রতাপদদ্ধ সাহারা মরুর মত সাংসারিক দাবানলের তলে তলে যে শান্ত শীতল ফল্গু ধারারূপে তাঁহার ধর্মজীবন বহিয়া চলিয়াছে তাহাই শত শত নরনারীর প্রাণে এক অটুট বিশ্বাস ও আশা রাখিয়া গিয়াছে যে “অসংখ্য বন্ধন মাঝে” শান্তিপূর্ণ মুক্তি সম্ভব এবং এই “মাটির মানুষই” তাহার অধিকারী হইতে পারে। “শ্রীশ্রীগুরুচাঁদ চরিতের” মধ্যেও শ্রীশ্রীগুরুচাঁদের বিরাট জীবনের এই দুইটি ধারা ওতঃপ্রোত ভাবে দেখাইবার চেষ্টা করা হইয়াছে। তাঁহার মহান জীবন ঘন ঘোরাচ্ছন্ন মানব জীবন পথের অত্যুজ্বল আলোকবর্তিকা। তাই বিশ্ববাসী নরনারীগণকে আহ্বান করিয়া বলিতেছি- এস ভাই-ভগিনীগণ। যদি সংসার তাপ-জ্বালা-দগ্ধ জীবনে পরমানন্দ লাভ করিতে চাও- যদি ‘সীমার’ সহিত ‘অসীমের’, জীবাত্মার সহিত পরমাত্মার মিলন করাইতে চাও, তবে এসো। তোমার অভিস্পিত আদর্শ এইখানেই পাইবে। শ্রীশ্রীগুরুচাঁদের মহান জীবনের আদর্শই তোমাকে প্রকৃত পথে লইয়া যাইবে। ইহা ভিন্ন আর উপায় নাই।
“নাহন্যো বিদ্যতে পন্থায়নায়”
পরিশেষে নিবেদন এই যে এই গ্রন্থ প্রণয়ন কার্যে যে সমস্ত মতুয়া-ভক্ত বিষয় সংগ্রহ করিয়া ও অন্যান্য বিষয়ে নানা প্রকারে আমাকে সাহায্য করিয়াছেন তাহাদিগকে আমার সশ্রদ্ধ কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করিতেছি। সর্ব সাধারণ পাঠক ও ভক্তগণের নিকট বিনীত প্রার্থনা এই যে আমার অজ্ঞতা বশতঃ গ্রন্থ মধ্যে যদি কোন কিছু অসামঞ্জস্য দেখা দিয়া থাকে, অনুগ্রহ করিয়া আমাকে জানাইলে পরবর্তী সংস্করণে সে সমস্তগুলি সংশোধন করা যাইবে। সত্বর মুদ্রণ কার্য শেষ করিবার ব্যস্ততার মধ্যে প্রুফ দেখা সত্বেও গ্রন্থে যথেষ্ট ভ্রম প্রমাদ রহিয়া গিয়াছে। পাঠকবর্গ স্বীয় স্বীয় উদারতাগুণে সে সমস্ত ত্রুটি বিচ্যুতি ক্ষমা করিয়া কৃতজ্ঞতা পাশে আবদ্ধ করিবেন। অলমিতিতে বিস্তারেণ। ওঁ শান্তি। ওঁ শান্তি।। ওঁ শান্তি।।।
বেঙ্গল বোর্ডিং হাউস্ বিনীত নিবেদক -
৪৬/৭ হ্যারিসন রোড, কলিকাতা : শ্রীমহানন্দ হালদার
২৮শে জ্যৈষ্ঠ ১৩২ ঠাকুরাব্দ
১৩৫০ বঙ্গাব্দ, ১৯৪৩ খ্রিষ্টাব্দ।