প্রকাশকের নিবেদন (কপিল কৃষ্ণ ঠাকুর)
জাগ্রত চেতনা: দেখি, শুনি, পড়ি, জানি – মননে-বচনে-কর্মে সমাজ জাগরণ
প্রকাশকের নিবেদন (কপিল কৃষ্ণ ঠাকুর)
শ্রীশ্রীঠাকুরের কৃপায় প্রায় চল্লিশ বৎসর পর “শ্রীশ্রীগুরুচাঁদ চরিত” আবার মুদ্রিত ও প্রকাশিত হল।
গ্রন্থের মুখবন্ধে এই গ্রন্থ যাঁর অমিয়-চরিত-কথা, যুগনায়ক রাজর্ষি সেই শ্রীশ্রীগুরু্চাঁদের এবং তিনি যার ভাবাদর্শ বাণী-বিগ্রহ, যুগাবতার সেই শ্রীশ্রী হরিঠাকুরের আবির্ভাবের কারণ সম্বন্ধে অতি সংক্ষেপে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ব্যক্ত করা বিধেয়।
যুগাবতাররূপে পরমপিতা পরমেশ্বরকে বহুবার অবতার গ্রহণ করতে হয়েছে এই ধরাধামে। যিনি সর্বশক্তিমান, তিনি সাকার কি নিরাকার, তাঁর কি প্রয়োজন, প্রয়োজন নয়, তিনি কি করবেন না করবেন- তার সীমারেখা টানা আমাদের শুধু ধৃষ্টতা নয় মূঢ়তাও। এক ও অদ্বিতীয় তিনি যদি নিরাকারই তবে এ সাকার বিশ্ব কোন্ দ্বিতীয় সাকারের সৃষ্টি? ‘অসম্ভব’ কথাটি আমাদের অজ্ঞদের সৃষ্টি, তাঁর সৃষ্টিতে সকলই সম্ভব।
যে যুগে যতটুকু প্রয়োজন, সে যুগে তিনি ততটুকুই সাধন করেন। রাম অবতারে মদদৃপ্ত ধর্মাদ্রোহী পাপিষ্ঠ রাক্ষসবংশ ধ্বংস করে আদর্শ নৃপরূপে তিনি রামরাজ্য স্থাপন করে গেছেন। সে যুগে তাঁর আর প্রয়োজন ছিল না। কৃষ্ণ অবতারে মদগবিত ধর্মদ্রোহী স্বৈরাচারী পাপিষ্ঠ কংস, জরাসন্ধ, শিশুপাল প্রভৃতি অসুরদের, কুরুক্ষেত্র মহাসমরে দুর্যোধনাদি ক্ষত্রকুলাংগারদের, এমন কি আপন যদুকুল পর্যন্ত নির্মূল করে তিনি জগতে ধর্মরাজ্য পুনঃ প্রতিষ্ঠিত করে গীতাধর্মে আবার সনাতন মানব-ধর্মের অমৃতবাণী, অভয়বাণী শুনিয়ে গেছেন। এ পর্যন্তই তাঁর প্রয়োজন ছিল ঐ যুগে।
তারপর ধীরে ধীরে অতিবাহিত হল শত শত বৎসর। এই সুদীর্ঘ কালের মধ্যে পরিবর্তনশীল জগতের অনেক পরিবর্তন ঘটল। সনাতন বর্ণ-ধর্ম জাত-ধর্ম বংশধর্মে পরিণত হল। মুষ্টিমেয় জাত শ্রেষ্ঠের হাতে রাষ্ট্রব্যবস্থা, ধর্মব্যবস্থা, সমাজব্যবস্থা বিপর্যস্ত হল। ব্রাহ্মণ্যধর্ম ব্রাহ্মণের ধর্মে পরিণত হল। জাতশ্রেষ্ঠ ব্রাহ্মণগণের চিরশ্রেষ্ঠত্ব চিরপ্রভুত্ব রক্ষার জন্য সমাজকে ভেংগে খণ্ড বিখণ্ড করে পরস্পরের মধ্যে উৎকট বিভেদ বিদ্বেষ সৃষ্টি করা হল। ধর্মের নামে মিথ্যা-আচার-ভিত্তিক-বিচারের অনুশাসনে নিত্য-শোষণ চলতে লাগল। উচ্চ-নীচ-ছোট-বড়-স্পৃশ্য-অস্পৃশ্য-ভেদ-বৈষম্য, নির্বিচার অত্যাচারে, নির্মম অবমাননায় মানুষের অধিকার বঞ্চিত নির্যাতীতদের জীবনযাত্রা দুর্বিষহ হয়ে উঠল। তারা দলে দলে ধর্মান্তর গ্রহণে প্রাণের জ্বালা জুড়াতে লাগল। ঐক্যহীন দুর্বল জাতি বার বার পরাধীনতার শৃঙ্খলে বদ্ধ হল। নানা ধর্মমত উপধর্মের সৃষ্টি হল। ধর্মবিপ্পব, সমাজ বিপ্লব ও রাষ্ট্র-বিপ্লবে ঘোর তমসাচ্ছন্ন এই চরম দুর্যোগযুগে শংকর এলেন, কত মহাপুরুষ এলেন, এলেন শ্রীচৈতন্য। তাঁরা নানা তত্ত্বোপদেশে, প্রেম ধর্ম প্রচারে মুমূর্ষু জাতির প্রাণ রক্ষা করলেন কিন্ত এঁদের কেউই অবতার নন। কেউ বৈদান্তিক, কেউ দার্শনিক, কেউ সিদ্ধযোগী। চৈতন্য-কৃষ্ণ-প্রেম পরমপাগল ভক্ত, মহাপণ্ডিত। প্রেম ধর্ম প্রচারের দ্বারা ধর্মান্তর গ্রহণ থেকে হিন্দু ধর্মকে রক্ষার জন্য তিনি বহ ঐতিহাসিক, মনীষী এবং তাঁর ভক্তবৃন্দের নিকট অবতার রূপে স্বীকৃত। তাঁর প্রেম ধর্ম হিন্দু জাতিকে আপাততঃ রক্ষা করল বটে, কিন্ত পতিত জাতির আরো অধঃপতন ঘটাল। দিন দিন তাঁরা দলে দলে সেবা-দাসী রেখে সংসার ধর্ম ত্যাগ করে কু-আদর্শে সমাজকে কলংকিত করতে লাগল। জাতি আবার ধ্বংসের পথে।
এমনি সংকট কালে দুষ্কৃতিদমন এবং ধর্ম-সংস্থাপনের জন্য পূর্ণরূপে যিনি অবতীর্ণ হলেন তিনিই শ্রীশ্রীহরিচাঁদ ঠাকুর শ্রীশ্রীগুরুচাঁদ ঠাকুরের পরমারাধ্য পিতৃদেব।
শ্রীশ্রীঠাকুর এবার আর ক্ষত্রিয়কুমাররূপে নয়, ব্রাহ্মণতনয়রূপে নয়, এবার এলেন এক অভাবনীয় রূপে অভিনবরূপে, পতিতপাবনরূপে পতিতের ঘরে। পতিত উদ্ধারের জন্য পূর্বে আর কোন অবতারই হয়নি।
তিনি এবার মুষ্টিমেয় দুষ্কৃতদমনের কথা আদৌ ভাবলেন না। গভীরভাবে ভাবলেন শত শত বৎসরের নিষ্ঠুর শাসন-শোষণের ঘোর তমসাচ্ছন্ন সর্বহারাদের কথা, সমাজের বৃহত্তম অংশ পতিতদের কথা, তাদের উত্থানের কথা। জ্ঞানীজন গ্রাহ্য কৃষ্ণ-শংকর-চৈতন্যের গভীর-জ্ঞান-গর্ভ তত্বোপদেশে এদের উদ্বুদ্ধ করা সম্ভব নয়। বিদ্যাহীন বুদ্ধিহীন আত্মবিশ্বাসহীন এদের হীনমন্যতা দূর করতেই হবে। তাদের বুঝাতে হবে তারা মানুষের সকল অধিকারে তাদেরও সমান অধিকার। তাদের বুঝাতে হবে, ত্যাগ-ধর্ম তাদের ধর্ম নয়। তাদের আগে ভোগ, প্রয়োজনে পরে ত্যাগ। ভোগের সুখানুভব দ্বারা পরম সুখানুভূতির ত্যাগই সার্থক ত্যাগ। ভোগ ভিন্ন ত্যাগ হয় না। এই ভোগের জন্য ধন চাই, বিদ্যা চাই। লক্ষ্মী সরস্বতী যার সহায় সে-ই সুখী। এই লক্ষ্মী সরস্বতী সাধনায় তমোগুণাচ্ছন্ন দুর্বল পতিতদের হীনমন্যতা দূর করে আত্মচেতনায় উদ্বুদ্ধ করতে পারলে তবেই তারা তেজোবীর্যবলে রজোগুণান্বিত হয়ে সত্ত্বগুণের অধিকারী হবে।
তাই পতিতদের শারীরিক ও মানসিক সর্বাংগীন বিকাশ ও পরিণতি, সামঞ্জস্য ও চরিতার্থতা-বিধানের জন্য সৎশিক্ষার ব্যাপক প্রচার ও প্রসার এবং তার দ্বারা রাজনীতিতে যোগ্যতা অর্জনের উপায় তিনি বিশেষভাবে চিন্তা করেছেন। তিনি বলেছেন, যে নীতি দলীয় নীতি নয়, সকল নীতির শ্রেষ্ঠ-নীতি, সেই নীতিই রাজনীতি। রাজনীতি এমন নীতি, যে নীতির অভাবে ধর্ম-অর্থ-কাম-মোক্ষ চতুবর্গের ফল লাভ সম্ভব নয়। পূর্ণ আদর্শ গৃহীরূপে নিজের জীবনের বহু আচরণের দ্বারা তিনি পতিতদের পাবনের বিধান করেছেন। প্রচুর-অর্থ-সাপেক্ষ নানা-আড়ম্বর-সর্বস্ব তথাকথিত নিছক পুজাপার্বণাদি বর্জনে তিনি সর্বসাধারণের গ্রহণযোগ্য অতি সহজ অতি সরল-অতি উদার যুগোপযোগী সার্থক ধর্মমত প্রবর্তনের দ্বারা ধর্মসংস্থাপনের দৃঢ়ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
শ্রীশ্রীঠাকুরের এই ভাব-আদর্শ-বাণী-বিগ্রহ শ্রীশ্রীগুরুচাঁদ এই ভাব, এই আদর্শ, এই বাণী অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়িত করেছেন। ডঃ মীড সাহেবের সহায়তায় তিনি শ্রীধাম ওড়াকান্দীতে উচ্চ ইংরাজী বিদ্যালয় স্থাপন করেছেন। পতিতদের চণ্ডাল আখ্যা দূর করেছেন। শিক্ষাদীক্ষায় পুরুষের ন্যায় নারী জাতির যোগ্য আসন দিয়েছেন। সৎভাবে যে কোন প্রকারে অর্থ উপার্জনে উপদেশ দিয়েছেন। আদর্শ গৃহীরপে স্বয়ং অর্থ-উপার্জনের ব্যবস্থা করেছেন। প্রচুর অর্থ ব্যয়ে পৌত্রদের বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা শেষে রাজনীতি উচ্চ জ্ঞানলাভের জন্য ব্যারিষ্টারী পড়ার নিমিত্ত বিলাত পাঠিয়েছেন। আজ যে পতিতদের মধ্যে শত শত উচ্চশিক্ষিত জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছেন, এ শ্রীশ্রীঠাকুরের, শ্রীশ্রীশুরুচাঁদের কৃপায়। শ্রীশ্রীঠাকুর, শ্রীশ্রীগুরুচাঁদ পতিত জাতির পিতা পরিত্রাতা। “শ্রীশ্রীগুরুচাঁদ চরিত” শ্রীশ্রীঠাকুরের ভাবাদর্শ বাণীর সেই বাস্তবায়ন, যা মুমুক্ষুর মোক্ষসেতু, সংশয়ীর জ্ঞানাঞ্জন, দুর্বলের বল ধারণের মহামন্ত্র সমাজ তত্ত্বের, ধর্ম-তত্ত্বের সারকথা, শেষ কথা।
গ্রন্থখানি ছাপতে প্রচুর অর্থের প্রয়োজন। কোথা এত অর্থ? আপ্রাণ চেষ্টায় বহুদিন পর প্রচুর অর্থ ব্যয়ে আমরা নিজস্ব প্রেস করেছি। তথাপি প্রায় ষাট হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে বর্তমান গ্রন্থ প্রকাশে।
শ্রীশ্রীঠাকুরের ১৭১তম আবির্ভাব মহোৎসবের ভক্তগণ গ্রন্থখানি যাতে হাতে হাতে পেতে পারেন, সেজন্য দ্রুত ছাপার কার্য শেষ করার জন্য ভূলত্রুটি থাকা অসম্ভব নয়। সেজন্য আমরা ক্ষমাপ্রার্থী।
ঠাকুরনগর, উত্তর ২৪ পরগণা। বিনীত নিবেদক-
৯ই চৈত্র মহাবারুণী দিবস, ১৩৮৮ সাল। শ্রীকপিল কৃষ্ণ ঠাকুর